আময়ডেন সেন্ট্রাল জেলের ছোট্ট কেবিনটিতে বসে ভাবছে রন হাওয়ার্ড, জনের একমাত্র ছেলে। স্ত্রীকে হারিয়েছে বহুদিন হয়ে গেল, কাজের চাপের নিজের আপন ছেলেকেও দেখার সুযোগ তেমন হয় না রনের। ঠিক দুবছর সাতমাস নয়দিন হয়ে গেল তার ছেলেকে না দেখার। হয়তো আরও বেশি হবে সময়টা; বাইরের আলোবিহীন এ কেবিনে দিন-তারিখ ঠিক রাখা ভার। তার বাবাকে লেখা শেষ চিঠির কথা ভাবল সে। হয়তো তার বাবা এখনও তার গ্রেফতার হওয়ার ব্যাপারে কিছুই জানে না, জানার কথাও না।
শুধুই কি গ্রেফতার, কদিন পর তার মৃত্যুদণ্ড হতে যাচ্ছে। সবকিছু করা হচ্ছে অত্যন্ত গোপনে, আময়ডেনের সরকারী প্রশাসনের শুধুমাত্র কর্তাব্যক্তিরা ছাড়া এ ব্যাপারে আর কেউ কিছু জানে না। সে অবশ্য আময়ডেনে ছিল অনেক সতর্কভাবেই, কিন্তু ঘরের শত্রু বিভীষণ হলে আর করার কিছু থাকে না। সে প্রথমে ভেবেছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রেফতার হওয়ার পর তিনিই সব ফাঁস করে দিয়েছেন হয়তো, এটা সে তার বাবাকে জানিয়েছিল; কিন্তু গ্রেফতার হবার দিন সে বুঝেছে, আসলে তার সহচরই ফাঁসটা করেছে। সে প্রথমে কোনো সহচর নিতে চায়নি, তার বাবাই কিনা জোর করে একটা সহচর পাঠিয়ে দিল। আর এখন কিনা তার জন্যই তাকে জীবন দিতে হচ্ছে।
কেবিনের একপ্রান্তে একটা ছোট্ট ফুটো আছে, সেটা দিয়ে বাইরে তাকানো যায়। সে ফুটো দিয়ে বাইরে তাকানোর চেষ্টা করেছেঃ সামনে শুধু দেখা যায় বিশাল এক কোরিডোর, ২৬ ঘন্টাই আলো জ্বালানো থাকে, বোঝার কোনো উপায় নেই বাইরে দিন না রাত। প্রতিদিন দ্বিতীয় বেলা খাবার দেয়ার সময়কে সে একদিন হিসেবে বিবেচনা করে। মাঝে মাঝে সে একধরণের উষ্ণ বাতাস অনুভব করতে পারে, এটা তার কাছে অপরিচিত নয়। মিলিটারি ট্রেইনিং-এর সময় সে এ অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিল। তাই সে আন্দাজ করতে পারে সে কোথায় আছেঃ এভারগ্রীন ফরেস্টের খুবই নিকটে কিংবা একদম গ্রেট রিভারের ধার ঘেঁসে। তবে কয়েকশ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর কোথায় থাকতে পারে, তা বলা ভার।
মাঝে মাঝে নিশ্বাস নিতে তার কষ্ট হয়, বুঝতে পারে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। শীতের এ রাতে অক্সিজেন কমে গেলে কেমন ঝিম ধরে, ঝাপসা চোখে ভেসে ওঠে অনেক পুরনো স্মৃতি, স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে মনে পড়ে বেলের কথা। ভাবে, বেচারা বেল, আর কদিন পর সে এতিম হতে চলছে।
বিকেলে পিটারসন মেরোরিয়ালের তার সেই চিরচেনা বেঞ্চটিতে বসে আছে ফ্রেড, বরাবরের মতোই তার দৃষ্টি চিরসবুজ পাতার ওপরে আশ্রয় নেয়া তুষার কণার দিকে। ভাবে, আজব এ মহাবিশ্ব! টিকে থাকতে গেলে সবাইকেই কোথাও না কোথাও, কারো না কারো উপরে আশ্রয় নিতে হয়। সে কোনোদিন রাজনীতিতে কান দেয়নি, আর আজ নিজের অজান্তেই এক কঠিন রাজনীতির শিকারঃ সে জানে না কতটা কঠিন, কিন্তু এভারগ্রীন মাউন্টেন থেকে যে প্রতিবছর তুষার ঝড় এগিয়ে আসে ইলিয়ায়, তার ভয়াবহতা সম্পর্কে তার বেশ ভাল ধারণা আছে। জন আজকে এই উদাহরণটাই তাকে দিয়েছিল। সে কি বড় একটা ভুল করে বসল? জন বা তাকে এত বিশ্বাসই করে কি করে? সে তো অজপাড়া গায়ের এক সামান্য ছেলে, যার জন্মের আগেই বাবা মারা গেছে। আজকেই প্রথম তার মাথায় এ চিন্তা কাজ করছে না, এর আগেও করেছে, কিন্তু কোনো সদুত্তোর তার মাথায় আসেনি।
একটা জিনিস সে বুঝতে পেরেছে আজকের কথায়, তা হলোঃ জনের পরাজয় নিশ্চিত এবং তার বিপরীতে হাল ধরবার মতো আর কেউ নেই। জনের ছেলের আজ পর্যন্ত সে কোনো খবর পায়নি, জনের শেষ চিঠিরও কোনো উত্তর আসেনি। ফ্রেড ভাবে, সে যখন ভার্সিটিতে উঠেছিল, তখনও তো দেশের সবকিছু ঠিকই চলছিল, এ রাজনৈতিক সংকটের উদয় হল আবার কবে? তার এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো কেউ নেই। ড্যান থাকলে বোধ হয় এর উত্তর দেয়ার জন্য ব্যর্থ চেষ্টা করত। তার নজর গেল এবার পিটারসনের সেই ছবির দিকে। ভাবল, খামোখাই পিটারসন নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। তার পরে মানুষ কতটা অসভ্য হতে পারে, কতভাবে বিভক্ত হতে পারে জানলে তিনি নিশ্চিত তার জীবন দিতেন না এসব স্বার্থপর মানুষদের জন্য। জন লোকটাও খারাপ মানুষ না, তার পরিবারের অন্যসবার মতোই তিনিও দেশের কথা, দশের কথা চিন্তা করেন। কিন্তু কি লাভ হচ্ছে তার? নিজের ছেলের আজ খবর নেই, নিজের নাতিকে রেখেছেন এমন একজনের বাসায়, যাকে তিনি চেনেন মাত্র কয়েকমাস থেকে। এমনকি নিজে দিনরাত ২৬ ঘন্টা জীবনহানির ভয়ে থাকেন। যতদূর বোঝা যায়, তিনিও পিটারসনের মতোই আরেক বলির পাঁঠা হতে যাচ্ছেন।
মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধের অভাব তো ছিল না কখনোই, তাহলে এমন হচ্ছে কেন? কেন আজ বিশাল সাম্রাজ্য খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে গেল? এখানে কার স্বার্থ কাজ করছে? এ প্রশ্নগুলো মাঝে মাঝেই উদয় হয় ফ্রেডের মনে। কিন্তু এর কোনো উত্তর নেই। কারণ অধিকাংশ মানুষদের মতো তারও আছে একটা মানবিক দূর্বলতাঃ সেও আদর্শহীন বিবেক দ্বারা চালিত এক মানবতাধারী যন্ত্র।
Showing posts with label অসম্ভব. Show all posts
Showing posts with label অসম্ভব. Show all posts
অসম্ভবঃ আট
জনের কথায় রাজী না হয়ে আসলে তার আর কোনো উপায় ছিল না। তাই অবশেষে সে বেলকে গ্রামে রেখে এল। যে গ্রামে সে আর কখনো ফিরে যেতে চায়নি সেখানেই তাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেতে হল। তবে গ্রামে গিয়ে সে চাচার বাড়ী থেকেই বের হয়নি। তার চাচারা বেজায় ভালো মানুষ, গ্রামের সহজ সরল মানুষ বলতে যা বোঝায় আর কি! না হলে জনের কথায় তারা এত সহজে রাজী হয়! জনের নাতি বেল খুবই নিরব প্রকৃতির ছেলে। এ বয়সে এমন স্বভাবের ছেলে তেমন একটা দেখা যায় না। ফ্রেডের সাথে গ্রামে গিয়ে সে আরো নিশ্চুপ হয়ে গেছে। চাচার বাড়ীতে ফ্রেড আগে যে রুমে থাকত সেখানেই বেলকে থাকার জায়গা দেয়া হয়েছে। মাত্র ৫ বছরের একটা ছেলে একা একটা ঘরে কীভাবে থাকবে সেটা নিয়ে অবশ্য চাচাদের মাঝে বেশ পরামর্শ চলেছে। কিন্তু বেলের স্বভাব ও আচরণ দেখে তারা বুঝল, এ ছেলেকে নিয়ে চিন্তা করার কোনো কারণ নেই।
ভার্সিটিতে ফিরে এসে ফ্রেড যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। তাই তো সে জানালা দিয়ে বাইরের তুষার ঢাকা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকার ভান করে জীবনের সুখস্মৃতিগুলো স্মরণ করছিল।
জীবনের সুখস্মৃতিগুলো যেন কেমন, এদের স্মরণ করলে মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ভাবের উদয় ঘটে, জীবনের দৃশ্যপট যেন মুহূর্তেই বদলে যায়। তবে দুর্ভাগ্যই বলা চলে, এই ভাব বেশীক্ষণের জন্য স্থায়ী হয় না। কেন স্থায়ী হয় না - তা একটা বড় প্রশ্ন বটে। সম্ভবতঃ জীবনের কঠিন বাস্তবতা এই ভাবকে তার প্রতি তাচ্ছিল্য মনে করে দূরে সরিয়ে দেয়, অথবা কোনো অলীক কারণও থাকতে পারে যা হয়তো মানবজাতির কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। সুখস্মৃতিগুলোকে স্মরণ করতে করতে ফ্রেড যে কখন ভাবনার রাজ্যে চলে গিয়েছিল বুঝতে পারল না।
ফ্রেড তার দৃষ্টি জানালা থেকে সরিয়ে এবার তার রুমে নিবদ্ধ করল। দেখল, ড্যান তার দিকে চেয়ে আছে। সম্ভবতঃ সে গভীরভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। তার দিকে তাকাতেই সে জিজ্ঞেস করল, 'কি ব্যাপার এত তাড়াতাড়ি ফিরলে যে?'
- বাসায় ভাল লাগছিল না।
- কেন? বাসায় কোন সমস্যা হয়েছে নাকি?
- না, এমনিতেই ভালো লাগছিল না।
ফ্রেডের মুখের দিকে তাকিয়ে ড্যান আর কিছু বলল না।
ফ্রেড উঠে দাঁড়াল। এরপর জ্যাকেটটা হাতে নিতে নিতে ড্যানকে লক্ষ করে বলল, 'আমার এখন একটা ক্লাস আছে। পরে কথা হবে।'
কথা শেষ করে সে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
জন তার অফিসের চেয়ারে বসে ভাবছিল তার জীবনের অতীত, বর্তমান ও সম্ভাব্য ভবিষ্যতের কথা, এক দেশ ও এক জাতিকে টিকিয়ে রাখতে তার পরিবারের নিঃস্বার্থ কুরবানীর কথা। কিন্তু তার চোখ সীমাহীন ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পারছিল না। অবশেষে সে নিজেকে সান্তনা দেবার চেষ্টা করল এটা ভেবে যে, জনগণের সাথে একটা পরিবার কি করে পারবে? সবাই তো তথাকথিত স্বাধীনতা চাচ্ছিল। কি করে তাদেরকে স্বাধীনতা অর্জন থেকে বিরত রাখা যাবে? কি করে তাদেরকে একথা বুঝানো যাবে যে, যে স্বাধীনতার জন্য তারা আন্দোলন করছে তা আসলে আরেক পরাধীনতার দরজা মাত্র? সুখ জিনিসটা মানুষ এত চায় অথচ যখন তা মানুষের কাছে ধরা দেয় তখন মানুষ তাকে সুখ বলে কেন যে চিনতে পারে না - তা জনের মাথায় আসে না। হতে পারে মানুষ আসলে মন থেকে সুখ চায় না অথবা এও হতে পারে যে, সুখ আসলে নিছক কল্পনা মাত্র।
জীবনের অনেকটা সময় জন পার করে এসেছে কেবল স্বপ্ন দেখে; তখন আবশ্য সে এতকিছু ভাবেনি। তখনো তো সে একজন নব্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিল মাত্র। আর এখন সে একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। এখন সবাই তাকে সম্মান-শ্রদ্ধা করে। সে ভাবে, তার মনের কথাগুলো যদি মানুষ জানত বা বুঝত তাহলে কতকিছুই না হতে পারত। একটা দেশের প্রধান হয়েও নিজের অপারগতার কাছে সে কত অসহায়! কিন্তু একথা সে ছাড়া আর কেউ জানতেও পারে না কিংবা পারে না বুঝতেও।
মানুষ বড়ই অদ্ভুত প্রজাতির, ভাবে জন। দুই দিনের পরিচয়েই তারা মনে করে তারা একে অপরকে চিনে ফেলেছে, অথচ একটা সময় আসে যখন বুঝতে পারে তাদের এ ধারণা সত্যি ছিল না। তারা নিজেদেরকে আবার নতুন করে চিনতে শেখে কিন্তু আবারো একই ভুল করে। এত এত যুগ পার হলো কিন্তু মানুষের এই প্রাচীন অভ্যাসের কোনো পরিবর্তন এল না।
জনের পিএস তার কক্ষে প্রবেশ করল। তার হাতে একটা চিঠি। চিঠিটা জন হাতে নিয়ে উল্টে-প্লাটে দেখল। চিঠিতে কোনো প্রেরকের নাম লেখা নেই। কিন্তু হাতের লেখা দেখে বুঝতে পারল চিঠিটা তার ছেলের লেখা।
চিঠি পড়ে জনের হতাশা আরও বেড়ে গেল মনে হল। সে অনেকদিন থেকে অবসরের কথা ভাবছিল; কিন্তু পরিস্থিতি মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে। একজন যোগ্য উত্তরসূরি ছাড়া যার তার কাছে ক্ষমতা যাওয়া মানে দেশের বারোটা বাজানো। তার মনে বড় আশা ছিল ছেলেকে সে দেশের রাজনীতিতে প্রবেশ করাবে। কিন্তু ছেলের ইচ্ছা দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো। সে আর না করেনি। তবে মনে মনে সে বড্ড হতাশ হয়েছিল। তাদের পরিবারের এতদিনের রাজনৈতিক ইতিহাসের সমাপ্তি তাকেই রচনা করতে হবে মনে হলে খুবই খারাপ লাগে তার। বড়ই ক্লান্ত সে, অথচ তার সামনে রাজ্যের কাজ পড়ে আছে।
চিঠিটা টেবিলে রেখে রিভলভিং চেয়ার ঘুরিয়ে পেছনের জানালার দিকে মুখ করে বসল। বাইরের প্রকৃতিতে শীত তার মনকেও যেন স্পর্শ করল। কোন চিরসবুজ গাছের পাতা আজ আর দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না, ক্রান্তীয় পাতাহীন গাছগুলোকে অনেকটা ক্যাকটাসের মতো লাগছে। চারদিকে সাদা তুষার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। সাদা তুষারের দিকে এক দৃষ্টতে তাকিয়ে থাকলে মাথা কেমন ঝিম ঝিম করে, চোখে ক্লান্তি নেমে আসে। শান্ত, নীরব এ প্রকৃতি যেন জনের দীর্ঘজীবনের ক্লান্তিকর মুহূর্তগুলোকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। চোখ ফিরিয়ে নিল জন। হেলেপড়া সাদা সূর্যের মতো সেও যেতে চায় শেষ দিগন্তে; কিন্তু অসীম এ সৃষ্টি জগতে সে দিগন্তের দেখা সর্বদা মেলে না। আর যেদিন মেলে সেদিন সবকিছু ছেড়ে পাড়ি দিতে হয় অজানা পথ। মুহূর্তে গা শিউরে উঠল জনের। সে এ পথ পাড়ি দিতে কতটা প্রস্তুত?
ভার্সিটিতে ফিরে এসে ফ্রেড যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। তাই তো সে জানালা দিয়ে বাইরের তুষার ঢাকা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকার ভান করে জীবনের সুখস্মৃতিগুলো স্মরণ করছিল।
জীবনের সুখস্মৃতিগুলো যেন কেমন, এদের স্মরণ করলে মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ভাবের উদয় ঘটে, জীবনের দৃশ্যপট যেন মুহূর্তেই বদলে যায়। তবে দুর্ভাগ্যই বলা চলে, এই ভাব বেশীক্ষণের জন্য স্থায়ী হয় না। কেন স্থায়ী হয় না - তা একটা বড় প্রশ্ন বটে। সম্ভবতঃ জীবনের কঠিন বাস্তবতা এই ভাবকে তার প্রতি তাচ্ছিল্য মনে করে দূরে সরিয়ে দেয়, অথবা কোনো অলীক কারণও থাকতে পারে যা হয়তো মানবজাতির কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। সুখস্মৃতিগুলোকে স্মরণ করতে করতে ফ্রেড যে কখন ভাবনার রাজ্যে চলে গিয়েছিল বুঝতে পারল না।
ফ্রেড তার দৃষ্টি জানালা থেকে সরিয়ে এবার তার রুমে নিবদ্ধ করল। দেখল, ড্যান তার দিকে চেয়ে আছে। সম্ভবতঃ সে গভীরভাবে তাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। তার দিকে তাকাতেই সে জিজ্ঞেস করল, 'কি ব্যাপার এত তাড়াতাড়ি ফিরলে যে?'
- বাসায় ভাল লাগছিল না।
- কেন? বাসায় কোন সমস্যা হয়েছে নাকি?
- না, এমনিতেই ভালো লাগছিল না।
ফ্রেডের মুখের দিকে তাকিয়ে ড্যান আর কিছু বলল না।
ফ্রেড উঠে দাঁড়াল। এরপর জ্যাকেটটা হাতে নিতে নিতে ড্যানকে লক্ষ করে বলল, 'আমার এখন একটা ক্লাস আছে। পরে কথা হবে।'
কথা শেষ করে সে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
জন তার অফিসের চেয়ারে বসে ভাবছিল তার জীবনের অতীত, বর্তমান ও সম্ভাব্য ভবিষ্যতের কথা, এক দেশ ও এক জাতিকে টিকিয়ে রাখতে তার পরিবারের নিঃস্বার্থ কুরবানীর কথা। কিন্তু তার চোখ সীমাহীন ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পারছিল না। অবশেষে সে নিজেকে সান্তনা দেবার চেষ্টা করল এটা ভেবে যে, জনগণের সাথে একটা পরিবার কি করে পারবে? সবাই তো তথাকথিত স্বাধীনতা চাচ্ছিল। কি করে তাদেরকে স্বাধীনতা অর্জন থেকে বিরত রাখা যাবে? কি করে তাদেরকে একথা বুঝানো যাবে যে, যে স্বাধীনতার জন্য তারা আন্দোলন করছে তা আসলে আরেক পরাধীনতার দরজা মাত্র? সুখ জিনিসটা মানুষ এত চায় অথচ যখন তা মানুষের কাছে ধরা দেয় তখন মানুষ তাকে সুখ বলে কেন যে চিনতে পারে না - তা জনের মাথায় আসে না। হতে পারে মানুষ আসলে মন থেকে সুখ চায় না অথবা এও হতে পারে যে, সুখ আসলে নিছক কল্পনা মাত্র।
জীবনের অনেকটা সময় জন পার করে এসেছে কেবল স্বপ্ন দেখে; তখন আবশ্য সে এতকিছু ভাবেনি। তখনো তো সে একজন নব্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিল মাত্র। আর এখন সে একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। এখন সবাই তাকে সম্মান-শ্রদ্ধা করে। সে ভাবে, তার মনের কথাগুলো যদি মানুষ জানত বা বুঝত তাহলে কতকিছুই না হতে পারত। একটা দেশের প্রধান হয়েও নিজের অপারগতার কাছে সে কত অসহায়! কিন্তু একথা সে ছাড়া আর কেউ জানতেও পারে না কিংবা পারে না বুঝতেও।
মানুষ বড়ই অদ্ভুত প্রজাতির, ভাবে জন। দুই দিনের পরিচয়েই তারা মনে করে তারা একে অপরকে চিনে ফেলেছে, অথচ একটা সময় আসে যখন বুঝতে পারে তাদের এ ধারণা সত্যি ছিল না। তারা নিজেদেরকে আবার নতুন করে চিনতে শেখে কিন্তু আবারো একই ভুল করে। এত এত যুগ পার হলো কিন্তু মানুষের এই প্রাচীন অভ্যাসের কোনো পরিবর্তন এল না।
জনের পিএস তার কক্ষে প্রবেশ করল। তার হাতে একটা চিঠি। চিঠিটা জন হাতে নিয়ে উল্টে-প্লাটে দেখল। চিঠিতে কোনো প্রেরকের নাম লেখা নেই। কিন্তু হাতের লেখা দেখে বুঝতে পারল চিঠিটা তার ছেলের লেখা।
চিঠি পড়ে জনের হতাশা আরও বেড়ে গেল মনে হল। সে অনেকদিন থেকে অবসরের কথা ভাবছিল; কিন্তু পরিস্থিতি মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে। একজন যোগ্য উত্তরসূরি ছাড়া যার তার কাছে ক্ষমতা যাওয়া মানে দেশের বারোটা বাজানো। তার মনে বড় আশা ছিল ছেলেকে সে দেশের রাজনীতিতে প্রবেশ করাবে। কিন্তু ছেলের ইচ্ছা দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো। সে আর না করেনি। তবে মনে মনে সে বড্ড হতাশ হয়েছিল। তাদের পরিবারের এতদিনের রাজনৈতিক ইতিহাসের সমাপ্তি তাকেই রচনা করতে হবে মনে হলে খুবই খারাপ লাগে তার। বড়ই ক্লান্ত সে, অথচ তার সামনে রাজ্যের কাজ পড়ে আছে।
চিঠিটা টেবিলে রেখে রিভলভিং চেয়ার ঘুরিয়ে পেছনের জানালার দিকে মুখ করে বসল। বাইরের প্রকৃতিতে শীত তার মনকেও যেন স্পর্শ করল। কোন চিরসবুজ গাছের পাতা আজ আর দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না, ক্রান্তীয় পাতাহীন গাছগুলোকে অনেকটা ক্যাকটাসের মতো লাগছে। চারদিকে সাদা তুষার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। সাদা তুষারের দিকে এক দৃষ্টতে তাকিয়ে থাকলে মাথা কেমন ঝিম ঝিম করে, চোখে ক্লান্তি নেমে আসে। শান্ত, নীরব এ প্রকৃতি যেন জনের দীর্ঘজীবনের ক্লান্তিকর মুহূর্তগুলোকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। চোখ ফিরিয়ে নিল জন। হেলেপড়া সাদা সূর্যের মতো সেও যেতে চায় শেষ দিগন্তে; কিন্তু অসীম এ সৃষ্টি জগতে সে দিগন্তের দেখা সর্বদা মেলে না। আর যেদিন মেলে সেদিন সবকিছু ছেড়ে পাড়ি দিতে হয় অজানা পথ। মুহূর্তে গা শিউরে উঠল জনের। সে এ পথ পাড়ি দিতে কতটা প্রস্তুত?
অসম্ভবঃ সাত
দেখতে দেখতেই ছুটি ফুরিয়ে এল। এখন গোটা হল আবার ভর্তি। ড্যানও এসেছে;
কিন্তু তার মন খারাপ। ফ্রেড কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলে যে তার সমস্যাটা
পারিবারিক। ফ্রেড আর কিছু বলেনি, হতে পারে তার পারিবারিক সমস্যাটা অনেক বড়
এবং তাকে বলার মতো নয়। সে নিজেও তো অনেক পারিবারিক ব্যাপার গোপন করে।
পৃথিবীটাকে অনেকসময় অনেক ছোট মনে হয় ফ্রেডের কাছে। একসময় সে কত স্বপ্ন দেখত! কিন্তু আজ নানা ঘটনার ঘনঘটায় এবং বিচিত্র ও নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় সে স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে, হারিয়ে ফেলেছে অনুভূতিও। মাঝে মাঝে তার মনে হয় - সে কি আসলেই একজন মানুষ? যদি সে মানুষ হয়েই থাকে তবে মানুষের সংজ্ঞা কি দাঁড়ায়? আর মনুষ্যত্ব? সেতো মানুষদের নিজেদেরই তৈরী করা একটা মতবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। নাহ, সে তো আর দর্শনের ছাত্র নয়, সে হলো অর্থনীতির ছাত্র, তার এসব জিনিস মাথায় আসবে না - এটাই তো স্বাভাবিক! তার মনে পড়ে ভার্সিটি জীবনের প্রথম দিকের দিনগুলির কথা, যখন সে স্বপ্নের মাঝে বিচরণ করতো, একদিন সে বড় হবে, তার গ্রামের মানুষদের সমালোচনার জবাব দেবে ইত্যাদি, এবং এসব স্বপ্ন দেখতে দেখতে তার ঘুমিয়ে পড়ার কথা। সত্যি বড় অদ্ভুত এ জীবন! কয়েক মাস আগেও তার কাছে স্বপ্নগুলো বেশ জীবন্ত মনে হতো, অথচ কয়েক মাসের ব্যবধানে এ স্বপ্নগুলো তার কাছে অন্তঃসার শূন্য মনে হতে লাগল! জন তাকে একবার বলেছিলেন যে জীবন নাকি অনেকগুলো পর্যায়ে বিভক্ত এবং প্রতিটি পর্যায়েই মানুষ জীবনকে নতুনভাবে চিনতে শেখে। হয়তো তার কথা ঠিক, হয়তো সে নতুন কোনো এক পর্যায়ে এসে হাজির হয়েছে।
ফ্রেড তার ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতির দিকে তাকাল। প্রকৃতিতে শীতের আমেজ নেমে এসেছে, প্রকৃতি শুভ্র রং ধারণ করতে শুরু করেছে। তার চোখ এবার চলে গেল আকাশের দিকে। আকাশে আজ একটি মাত্র চাঁদ। চাঁদটি যেন একাকীত্বের প্রতীক হয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সন্ধা নেমে আসছে, তারাগুলো চাঁদকে সঙ্গ দেবার চেষ্টা করছে, কিন্তু চাঁদ তাদের দিকে তাকায় না, হয়তো এ নিঃসঙ্গতাকে সে ভালোবাসে বলেই এমনটা করে অথবা তার জীবনে সে একাকী থাকবার সু্যোগ খুব কম পায় বলে আজ একটু একাকী থাকার চেষ্টা করছে।
ফ্রেড চোখ নামিয়ে নিল।
আগামীকাল জন তাকে ডেকেছে। তবে কারণ উল্লেখ করেনি, সে অবশ্য জিজ্ঞেস করার কৌতুহলও বোধ করেনি। অদ্ভুত মানুষ এই জন। দেখে কারো মনেই হবে না এই লোকটার ক্ষমতা কতটুকু হতে পারে।
নাহ, একটু পড়া দরকার, ভাবল সে। টেবিলে উল্টো করে রাখা বইটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল সে।
বাইরে চাঁদের আলোয় তুষার কণাগুলো জ্বল জ্বল করছে, আর আকাশের তারাগুলো যেন সেদিকে তাকিয়ে অবিরত নাচছে। শীতল এ মহাবিশ্বের কলঙ্কস্বরূপ তারাগুলো তুষার খুব কমই দেখতে পায়।
পরদিন সকালবেলা।
আজ আবার সেই পিটারসন পার্কে বসে আছে ফ্রেড। এখানেই জনের সাথে তার দেখা হবার কথা। গোটা পার্ক আজ সাদা রং ধারণ করেছে। শীতকালে সে কখনো খোলা কোনো স্থানে যায়নি, যদিও বা তার বাড়ি গ্রামে। জীবনে প্রথমবারের মতো নিজেকে তুষার ঢাকা ময়দানের মাঝে আবিস্কার করে ঠিক কেমন লাগছে, সে বুঝতে পারে না। এখনও শীত তেমন পড়েনি। তাই তুষারের স্তর খুবই পাতলা, দেখে মনে হয় সবকিছুর ওপর যেন চুনের আস্তরণ পড়ে আছে।
ঠিক সময়মত এবং পূর্বের মতো ঠিক পশ্চিম দিক দিয়েই এল জন। তার মুখে আজ হাসি নেই। মুখটি মলিন আর আজকের প্রকৃতির মতোই ফ্যাকাশে। ফ্রেড অভ্যাসমত আজও উঠে দাঁড়াল। জন হাসি টানার চেষ্টা করে বলল, "বস, বস।"
ফ্রেড বসল। বসল জনও।
একটু পর জন বলল, "আমি আজ তোমাকে এখানে ডেকেছি একটা ব্যক্তিগত কারণে, যা তুমি ছাড়া আর কেউ এমন কি ড্যানও জানবে না।"
ফ্রেড এতক্ষণ হেলান দিয়ে বসেছিল। জনের কথায় সে একটু নড়েচড়ে বসল। ভাবল, জনের আবার এমন কি গোপন কথা থাকতে পারে যা কিনা এমনকি ড্যানকেও বলা যাবে না!
জনই আবার মুখ খুলল, "তুমি হয়তো শুনে থাকবে মাস্কারাসদের ধ্বংস করার পর প্রতিটি রাজ্যের সব গভর্নরদের নিয়ে একটি শান্তি বৈঠক করা হয়।"
-"জ্বী। ৩০৪৭ সালের ২৩ আগস্ট।"
-"তা ঐ বৈঠকে প্রস্তাব করা হয় যে মাস্কারাসদের ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র মানুষ ব্যবহার করবে না; বরং সব অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলা হবে। এ বৈঠকে সকলে এ ব্যাপারে একমত হয় এবং ২ সেপ্টেম্বর সকল অস্ত্র একত্রে জমা করে ধ্বংস করা হয়। সে হিসেবে আর তো কোনো অস্ত্র থাকার কথা নয়। কিন্তু তিনদিন আগে আমার ছেলের কাছ থেকে জানতে পারলাম সব অস্ত্র ধ্বংস করা হয়নি। ঐ সময় ইলি নদীর ওপারের দুই রাজ্য, আময়ডেন ও এলবানডোর, গোপনে কিছু অস্ত্র তাদের গোপন অস্ত্রাগারে রেখে দেয়। আজ প্রায় তিনশ বছর পর একটা রিসার্চ টিম পুরনো সামরিক ঘাঁটি নিয়ে রিসার্চ করার সময় ঐ অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে। কিন্তু তারা এটা ওই দুই রাজ্যের সরকারের নির্দেশে গোপন রেখেছে। ঘটনাক্রমে আমার ছেলে ওই সময় আময়ডেন-এ ছিল। আময়ডেনের স্বরাষ্টমন্ত্রীর সাথে তার খাতির থাকায় সে এ ঘটনা জানতে পারে। শুধু তাই না তারা এসব অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সে ব্যাপারে তারা আজ দুই বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে বের করেছে। এখন তারা তা সামরিক কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে।"
বলে থামল জন। ফ্রেড বুঝতে পারছে এসব কথা জন কেন তাকে বলছে।
জন আবার বলা শুরু করল, "তুমি হয়তো মনে করছ, কেন তোমাকে এসব কথা বলছি। তবে আরেকটু ধৈর্য্য ধরে শোন। তো, আমার ছেলে নাকি এ ঘটনা জানতে পেরেছে অনেক আগে। কিন্তু বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। কিন্তু দিন কয়েক আগে আময়ডেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব গোপন কথা অনেকের কাছে ফাঁস করে দেবার অপরাধে গ্রেফতার হন। জেরাতে তিনি কাকে কাকে এ ঘটনা ফাঁস করেছেন তা বলে দেন এবং এতে আমার ছেলের নামও আসে। তিনদিন আগে আমার ছেলে আময়ডেনে যেখানে থাকে সেখানে আময়ডেনের সামরিক বাহিনী গোপনে আমার ছেলেকে গ্রেফতার করতে যায় কিন্তু ঘটনাক্রমে সেদিন সে সেখানে ছিল না বলে বেঁচে যায়। পরে এ ঘটনা জানতে পেরে সে আমাকে সবকিছু জানায় এবং আমাকে এবং তার ছেলেকে সাবধানে থাকতে অনুরোধ করে।"
থামল জন। ফ্রেড তাকে ডাকার উদ্দেশ্য এবার বুঝতে পারল। সে বলল, "তাহলে আপনি চাচ্ছেন আমি যেন আপনার নাতিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেই, যেখানে তাকে কেউ চিনবে না।"
-"অনেকটা সেরকমই। তোমার চাচার সাথে এ ব্যাপারে আমার কথা হয়েছে।"
-"কিন্তু এতে তো আমার পড়াশুনার ব্যাঘাত ঘটবে।"
-"না, তুমি তো আর বেলের সাথে থেকে যাচ্ছ না। তুমি শুধু বেলকে তোমার গ্রামে নিয়ে গিয়ে তাকে গ্রামের লোকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে যাতে সে ভয় না পায়।"
-"কিন্তু এতে আপনি আমাকে জড়াচ্ছেন কেন?"
-"কারণ বেল তোমাকে চেনে। তাকে এখন যদি অচেনা কোনো লোকের সাথে থাকতে বলি সে রাজি হবে না কিংবা জোর করেও যদি থাকতে বলি তাহলে হয়তো সে ভয় পাবে। আর তাছাড়া নিরাপত্তার কিছু ব্যাপারও আছে। আমি প্রত্যহ যাদের সাথে চলাচল করি এরা সবাই কমবেশি সুবিধাবাদী। যখন যে সরকার তখন সে সরকারের গোলামী করাই তাদের অভ্যাস। কাজেই এদের উপর ভরসা করা যায় না। আর বাকী যারা বন্ধু-বান্ধব আছে তাদের বাড়িতে থাকা নিরাপদ নয়। কারণ সামরিক বাহিনী বেলকে খুঁজতে এলে সবার আগে তাদের বাড়িতেই খোঁজ নেবে। তাই সবদিক বিবেচনা করে আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমাদের বাড়িতে বেল থাকলে কেউ তাকে সন্দেহ করবে না কিংবা বেলও ভয় পাবে না।"
-"কিন্তু সবাই তো জানে যে আমি আপনার নাতিকে পড়াই।"
-"না, ড্যান ছাড়া একথা আর কেউ জানে না। একজন নেতাকে নিজের নিরপত্তার জন্য ব্যক্তিগত জীবনের অনেককিছু গোপন করতে হয়। আমি ড্যানকে বুঝিয়ে বলব যেন সে একথা কাউকে না বলে। যা হোক, আগেই বলেছি তোমার চাচার সাথে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন যদি তুমি রাজী থাকো তাহলে তিনিও রাজী। এখন বল তোমার অভিমত কি?"
ফ্রেড ভেবে পায়না কি বলবে। তার সামনে তেমন কোনো বিকল্পও নেই। তবু সে বলল, "এ ব্যাপারে আমাকে ভেবে দেখতে হবে।"
"আমার হাতে সময় খুবই কম। তবু ভাবনার জন্য তোমাকে একদিন সময় দিলাম। কালকে ঠিক এই সময়ে এই স্থানে উপস্থিত থেকো।" বলে জন উঠে দাঁড়াল। তারপর ফ্রেডের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি হয়তো তোমার কাছে একজন খারাপ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কিন্তু বেল একটা নিষ্পাপ ছেলে। তার সামনে পুরো জীবনটাই পড়ে আছে এবং এ জীবনে তার নিজের চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলবার অধিকারও তার আছে। আশা করি বিষয়টা ভেবে দেখবে।"
কথা শেষ করে জন তার ডান হাত দিয়ে ফ্রেডের বাম কাঁধ বুলিয়ে যেদিক দিয়ে এসেছিল ঠিক সেদিক দিয়েই গেল। ফ্রেড সেদিকে চেয়ে থাকল।
পৃথিবীটাকে অনেকসময় অনেক ছোট মনে হয় ফ্রেডের কাছে। একসময় সে কত স্বপ্ন দেখত! কিন্তু আজ নানা ঘটনার ঘনঘটায় এবং বিচিত্র ও নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় সে স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে, হারিয়ে ফেলেছে অনুভূতিও। মাঝে মাঝে তার মনে হয় - সে কি আসলেই একজন মানুষ? যদি সে মানুষ হয়েই থাকে তবে মানুষের সংজ্ঞা কি দাঁড়ায়? আর মনুষ্যত্ব? সেতো মানুষদের নিজেদেরই তৈরী করা একটা মতবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। নাহ, সে তো আর দর্শনের ছাত্র নয়, সে হলো অর্থনীতির ছাত্র, তার এসব জিনিস মাথায় আসবে না - এটাই তো স্বাভাবিক! তার মনে পড়ে ভার্সিটি জীবনের প্রথম দিকের দিনগুলির কথা, যখন সে স্বপ্নের মাঝে বিচরণ করতো, একদিন সে বড় হবে, তার গ্রামের মানুষদের সমালোচনার জবাব দেবে ইত্যাদি, এবং এসব স্বপ্ন দেখতে দেখতে তার ঘুমিয়ে পড়ার কথা। সত্যি বড় অদ্ভুত এ জীবন! কয়েক মাস আগেও তার কাছে স্বপ্নগুলো বেশ জীবন্ত মনে হতো, অথচ কয়েক মাসের ব্যবধানে এ স্বপ্নগুলো তার কাছে অন্তঃসার শূন্য মনে হতে লাগল! জন তাকে একবার বলেছিলেন যে জীবন নাকি অনেকগুলো পর্যায়ে বিভক্ত এবং প্রতিটি পর্যায়েই মানুষ জীবনকে নতুনভাবে চিনতে শেখে। হয়তো তার কথা ঠিক, হয়তো সে নতুন কোনো এক পর্যায়ে এসে হাজির হয়েছে।
ফ্রেড তার ঘরের জানালা দিয়ে বাইরের প্রকৃতির দিকে তাকাল। প্রকৃতিতে শীতের আমেজ নেমে এসেছে, প্রকৃতি শুভ্র রং ধারণ করতে শুরু করেছে। তার চোখ এবার চলে গেল আকাশের দিকে। আকাশে আজ একটি মাত্র চাঁদ। চাঁদটি যেন একাকীত্বের প্রতীক হয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সন্ধা নেমে আসছে, তারাগুলো চাঁদকে সঙ্গ দেবার চেষ্টা করছে, কিন্তু চাঁদ তাদের দিকে তাকায় না, হয়তো এ নিঃসঙ্গতাকে সে ভালোবাসে বলেই এমনটা করে অথবা তার জীবনে সে একাকী থাকবার সু্যোগ খুব কম পায় বলে আজ একটু একাকী থাকার চেষ্টা করছে।
ফ্রেড চোখ নামিয়ে নিল।
আগামীকাল জন তাকে ডেকেছে। তবে কারণ উল্লেখ করেনি, সে অবশ্য জিজ্ঞেস করার কৌতুহলও বোধ করেনি। অদ্ভুত মানুষ এই জন। দেখে কারো মনেই হবে না এই লোকটার ক্ষমতা কতটুকু হতে পারে।
নাহ, একটু পড়া দরকার, ভাবল সে। টেবিলে উল্টো করে রাখা বইটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল সে।
বাইরে চাঁদের আলোয় তুষার কণাগুলো জ্বল জ্বল করছে, আর আকাশের তারাগুলো যেন সেদিকে তাকিয়ে অবিরত নাচছে। শীতল এ মহাবিশ্বের কলঙ্কস্বরূপ তারাগুলো তুষার খুব কমই দেখতে পায়।
পরদিন সকালবেলা।
আজ আবার সেই পিটারসন পার্কে বসে আছে ফ্রেড। এখানেই জনের সাথে তার দেখা হবার কথা। গোটা পার্ক আজ সাদা রং ধারণ করেছে। শীতকালে সে কখনো খোলা কোনো স্থানে যায়নি, যদিও বা তার বাড়ি গ্রামে। জীবনে প্রথমবারের মতো নিজেকে তুষার ঢাকা ময়দানের মাঝে আবিস্কার করে ঠিক কেমন লাগছে, সে বুঝতে পারে না। এখনও শীত তেমন পড়েনি। তাই তুষারের স্তর খুবই পাতলা, দেখে মনে হয় সবকিছুর ওপর যেন চুনের আস্তরণ পড়ে আছে।
ঠিক সময়মত এবং পূর্বের মতো ঠিক পশ্চিম দিক দিয়েই এল জন। তার মুখে আজ হাসি নেই। মুখটি মলিন আর আজকের প্রকৃতির মতোই ফ্যাকাশে। ফ্রেড অভ্যাসমত আজও উঠে দাঁড়াল। জন হাসি টানার চেষ্টা করে বলল, "বস, বস।"
ফ্রেড বসল। বসল জনও।
একটু পর জন বলল, "আমি আজ তোমাকে এখানে ডেকেছি একটা ব্যক্তিগত কারণে, যা তুমি ছাড়া আর কেউ এমন কি ড্যানও জানবে না।"
ফ্রেড এতক্ষণ হেলান দিয়ে বসেছিল। জনের কথায় সে একটু নড়েচড়ে বসল। ভাবল, জনের আবার এমন কি গোপন কথা থাকতে পারে যা কিনা এমনকি ড্যানকেও বলা যাবে না!
জনই আবার মুখ খুলল, "তুমি হয়তো শুনে থাকবে মাস্কারাসদের ধ্বংস করার পর প্রতিটি রাজ্যের সব গভর্নরদের নিয়ে একটি শান্তি বৈঠক করা হয়।"
-"জ্বী। ৩০৪৭ সালের ২৩ আগস্ট।"
-"তা ঐ বৈঠকে প্রস্তাব করা হয় যে মাস্কারাসদের ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র মানুষ ব্যবহার করবে না; বরং সব অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলা হবে। এ বৈঠকে সকলে এ ব্যাপারে একমত হয় এবং ২ সেপ্টেম্বর সকল অস্ত্র একত্রে জমা করে ধ্বংস করা হয়। সে হিসেবে আর তো কোনো অস্ত্র থাকার কথা নয়। কিন্তু তিনদিন আগে আমার ছেলের কাছ থেকে জানতে পারলাম সব অস্ত্র ধ্বংস করা হয়নি। ঐ সময় ইলি নদীর ওপারের দুই রাজ্য, আময়ডেন ও এলবানডোর, গোপনে কিছু অস্ত্র তাদের গোপন অস্ত্রাগারে রেখে দেয়। আজ প্রায় তিনশ বছর পর একটা রিসার্চ টিম পুরনো সামরিক ঘাঁটি নিয়ে রিসার্চ করার সময় ঐ অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে। কিন্তু তারা এটা ওই দুই রাজ্যের সরকারের নির্দেশে গোপন রেখেছে। ঘটনাক্রমে আমার ছেলে ওই সময় আময়ডেন-এ ছিল। আময়ডেনের স্বরাষ্টমন্ত্রীর সাথে তার খাতির থাকায় সে এ ঘটনা জানতে পারে। শুধু তাই না তারা এসব অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সে ব্যাপারে তারা আজ দুই বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে বের করেছে। এখন তারা তা সামরিক কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে।"
বলে থামল জন। ফ্রেড বুঝতে পারছে এসব কথা জন কেন তাকে বলছে।
জন আবার বলা শুরু করল, "তুমি হয়তো মনে করছ, কেন তোমাকে এসব কথা বলছি। তবে আরেকটু ধৈর্য্য ধরে শোন। তো, আমার ছেলে নাকি এ ঘটনা জানতে পেরেছে অনেক আগে। কিন্তু বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। কিন্তু দিন কয়েক আগে আময়ডেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব গোপন কথা অনেকের কাছে ফাঁস করে দেবার অপরাধে গ্রেফতার হন। জেরাতে তিনি কাকে কাকে এ ঘটনা ফাঁস করেছেন তা বলে দেন এবং এতে আমার ছেলের নামও আসে। তিনদিন আগে আমার ছেলে আময়ডেনে যেখানে থাকে সেখানে আময়ডেনের সামরিক বাহিনী গোপনে আমার ছেলেকে গ্রেফতার করতে যায় কিন্তু ঘটনাক্রমে সেদিন সে সেখানে ছিল না বলে বেঁচে যায়। পরে এ ঘটনা জানতে পেরে সে আমাকে সবকিছু জানায় এবং আমাকে এবং তার ছেলেকে সাবধানে থাকতে অনুরোধ করে।"
থামল জন। ফ্রেড তাকে ডাকার উদ্দেশ্য এবার বুঝতে পারল। সে বলল, "তাহলে আপনি চাচ্ছেন আমি যেন আপনার নাতিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেই, যেখানে তাকে কেউ চিনবে না।"
-"অনেকটা সেরকমই। তোমার চাচার সাথে এ ব্যাপারে আমার কথা হয়েছে।"
-"কিন্তু এতে তো আমার পড়াশুনার ব্যাঘাত ঘটবে।"
-"না, তুমি তো আর বেলের সাথে থেকে যাচ্ছ না। তুমি শুধু বেলকে তোমার গ্রামে নিয়ে গিয়ে তাকে গ্রামের লোকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে যাতে সে ভয় না পায়।"
-"কিন্তু এতে আপনি আমাকে জড়াচ্ছেন কেন?"
-"কারণ বেল তোমাকে চেনে। তাকে এখন যদি অচেনা কোনো লোকের সাথে থাকতে বলি সে রাজি হবে না কিংবা জোর করেও যদি থাকতে বলি তাহলে হয়তো সে ভয় পাবে। আর তাছাড়া নিরাপত্তার কিছু ব্যাপারও আছে। আমি প্রত্যহ যাদের সাথে চলাচল করি এরা সবাই কমবেশি সুবিধাবাদী। যখন যে সরকার তখন সে সরকারের গোলামী করাই তাদের অভ্যাস। কাজেই এদের উপর ভরসা করা যায় না। আর বাকী যারা বন্ধু-বান্ধব আছে তাদের বাড়িতে থাকা নিরাপদ নয়। কারণ সামরিক বাহিনী বেলকে খুঁজতে এলে সবার আগে তাদের বাড়িতেই খোঁজ নেবে। তাই সবদিক বিবেচনা করে আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমাদের বাড়িতে বেল থাকলে কেউ তাকে সন্দেহ করবে না কিংবা বেলও ভয় পাবে না।"
-"কিন্তু সবাই তো জানে যে আমি আপনার নাতিকে পড়াই।"
-"না, ড্যান ছাড়া একথা আর কেউ জানে না। একজন নেতাকে নিজের নিরপত্তার জন্য ব্যক্তিগত জীবনের অনেককিছু গোপন করতে হয়। আমি ড্যানকে বুঝিয়ে বলব যেন সে একথা কাউকে না বলে। যা হোক, আগেই বলেছি তোমার চাচার সাথে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন যদি তুমি রাজী থাকো তাহলে তিনিও রাজী। এখন বল তোমার অভিমত কি?"
ফ্রেড ভেবে পায়না কি বলবে। তার সামনে তেমন কোনো বিকল্পও নেই। তবু সে বলল, "এ ব্যাপারে আমাকে ভেবে দেখতে হবে।"
"আমার হাতে সময় খুবই কম। তবু ভাবনার জন্য তোমাকে একদিন সময় দিলাম। কালকে ঠিক এই সময়ে এই স্থানে উপস্থিত থেকো।" বলে জন উঠে দাঁড়াল। তারপর ফ্রেডের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি হয়তো তোমার কাছে একজন খারাপ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কিন্তু বেল একটা নিষ্পাপ ছেলে। তার সামনে পুরো জীবনটাই পড়ে আছে এবং এ জীবনে তার নিজের চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলবার অধিকারও তার আছে। আশা করি বিষয়টা ভেবে দেখবে।"
কথা শেষ করে জন তার ডান হাত দিয়ে ফ্রেডের বাম কাঁধ বুলিয়ে যেদিক দিয়ে এসেছিল ঠিক সেদিক দিয়েই গেল। ফ্রেড সেদিকে চেয়ে থাকল।
অসম্ভবঃ ছয়
জনের নাতিকে ফ্রেড পড়ায় প্রায় চার-পাঁচ মাস হয়ে গেল, অথচ এর মাঝে একদিনও
জনের সাথে তার দেখা হয় নি! প্রতিদিনের মতো আজও সে জনের নাতিকে পড়িয়ে বসার
ঘরে বসে ছিল। এমন সময় ঘরে প্রবেশ করল জন। জনকে দেখে ফ্রেড উঠে দাঁড়াল। জন
বলল, "বস, বস, আমার মতো একজন অধমকে দেখে দাঁড়ানোর কোন মানেই হয় না।" ফ্রেড
বসে পড়ল। জন আবার বলল, "তা আমার নাতিকে কেমন দেখলে?" "ভালই। পড়াশুনায় তার
বেশ আগ্রহ।" জবাব দিল ফ্রেড।
- "তোমার দিনকাল কেমন যাচ্ছে? শুনলাম এবার নাকি ছুটিতে বাড়ি যাওনি?"
- "জ্বী, নানা ব্যস্ততার কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।"
- "আচ্ছা, তোমার আর কোনো ভাই-বোন নেই?"
- "না, আমি আমার মায়ের একমাত্র সন্তান।"
- "তোমার মা কি গ্রামেই থাকেন?"
- "জ্বী।"
- "তোমার মা গ্রামে একা কীভাবে থাকেন?"
কথা বলল না ফ্রেড। কিভাবে সে জনকে নিজের মনের কথাগুলো বলবে? জীবনে সে অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আজ এতদূর এসেছে। আর এসময় তার পাশে বন্ধুর মতো পাশে থেকেছে তার মা। সে বাবার মুখ দেখেনি, তার চাচারা ছাড়া আর সবাই তাকে আর তার মাকে পরিত্যাগ করেছিল। কিন্তু তাতেও ফ্রেডের কিছু যায় আসেনি। একজন এতিম ছেলের মা-ই তার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু কে জানত একদিন তাকে তাও হারাতে হবে!
ফ্রেডের নীরবতা ছিল লক্ষ করার মতো। জন বলল, "একটা সময় ছিল যখন আমি প্রতিদিন গ্রামে যেতাম শুধুমাত্র গ্রামের প্রকৃতি দেখার জন্য। এটা নিয়ে আমার ভাইরা আমার সাথে টিটকারি করত। বাবাও আমাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। বাবার ইচ্ছা, আমি যেন একজন বড় উকিল হই। তিনি বড় ছেলেকে তার মতো পলিটিক্সের সাথে জড়িত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের জোরে আমিই হলাম রাজনীতিবিদ আর সে হলো উকিল। আমি তখনো ভাবিনি জীবনে বড় হয়ে ঠিক কি করব। জীবনের লক্ষ্য বলে যে কিছু আছে, তখন তা মাথাতেই আসত না। যখনই সময় পেতাম গ্রামে যেতাম, আর অপলক চোখে তাকিয়ে থাকতাম প্রকৃতির দিকে। যখন হাইস্কুলে উঠলাম তখন চারিদিকে হঠাৎ ভাঙনের ধ্বনি শুনতে পেলাম। একে একে সব রাজ্যগুলো ভাগ হতে লাগল। বাবা অনেক চেষ্টা করেও মন্ত্রীসভাকে টিকিয়ে রাখতে পারলেন না, রাজ্যপ্রধানগণ একে একে নিজেদের পদত্যাগপত্র জমা দিতে লাগল অথবা নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কেউ কেউ বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দিল। বাবা আমাদের সকলকে গ্রামে রেখে এলেন। আমরা তিনভাই আর মা - বেশ ভালই কাটছিল দিনগুলি। হঠাৎ একদিন গ্রামে আমার এক পরিচিত লোকের কাছে শুনতে পেলাম প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ বিদ্রোহীরা ঘিরে ফেলেছে। আমি দিক-বিদিক হারিয়ে রওয়ানা দিলাম রাজধানীর দিকে, যাবার সময় মা কিংবা ভাইদের বলার সুযোগও পেলাম না। রাজধানীতে গিয়ে শুনতে পেলাম, বাবা আর বেঁচে নেই। বাবাকে শেষ বারের মতোও দেখার সুযোগ পেলাম না। আমি যখন প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছে গেলাম, তখন মিথুনিয়ার তৎকালীন ও শেষ মেয়র আমাকে তাড়াতাড়ি করে তার বাসায় নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন যে আমার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যাওয়া মোটেও নিরাপদ নয়। তারা প্রেসিডেন্টকে মেরেছে, এখন তারা প্রেসিডেন্টের বংশ নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। আমি তাকে আমার মা ও ভাইদের কথা বললাম। তিনি একজন লোক পাঠিয়ে দিলেন আমার মা ও ভাইদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি। তারা আমার মা ও মেজভাইকে মেরে ফেলে। বড় ভাই পালিয়ে যায়। মাকেও শেষবারের জন্য দেখার সৌভাগ্য আমার হয়ে ওঠেনি। বড়ভাইকে প্রায় ১০ বছর ধরে খুঁজে বেড়িয়েছি, পাইনি।" একটা দীর্ঘশ্বাস নিল জন। "এটা আজ হতে প্রায় ৩০ বছর আগের ঘটনা। এই ৩০ বছরে কত পরিবর্তন এসেছে! আগে যে বাবা ছিলেন একজন দেশদ্রোহী, তিনি নিমেষে হয়ে গেলেন শহিদ। আদালত প্রায় জোর করে আমাদের এই পুরনো বাড়িটাতে আমাকে থাকার অনুমতি দিল। মিথুনিয়ার সাবেক মেয়রের অনুপ্রেরণায় আমি রাজনীতিতে প্রবেশ করি এবং আজ অবধি এ পথেই আছি। জীবনটা আসলে অনেক কমসময়ের জন্য। এখন বয়স চল্লিশ পার হয়ে গেলো। আর ক'দিনই বা বাঁচব! কম সময় হলেও বড় বিচিত্র এ জীবন! কত অভিজ্ঞতা, কত আনন্দ, বেদনা, কত পাওয়া, না পাওয়া! কিন্তু এ সবকিছুর পেছনে উদ্দেশ্য কি?" থামল জন।
জন থামলেও ফ্রেড কোন কথা বলল না। কি বলবে সে? বলার তো তার কিছুই নেই। সে এতদিন ভাবত যত দুঃখ-বেদনা সব যেন শুধুই তার। কিন্তু তার এ দাবী যে মোটেও সঠিক নয় তা সে আজ বুঝতে পেল। এ জীবনের কী উদ্দেশ্য? - অন্য সবার মতো তারও মাঝে এ প্রশ্ন খেলা করে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের মত সেও ভুলে যায় কোন জগতে সে বাস করছে।
আজ পিটারসন মেমোরিয়ালের পাশ দিয়ে যাবার সময় ফ্রেড পুলারের লেখা বই "হারানো স্বাধীনতা"র প্রথম খণ্ড কিনে নিয়ে গেল। জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার জন্য বোধ হয় এর চাইতে কোনো ভাল বই এ গ্রহে নেই।
- "তোমার দিনকাল কেমন যাচ্ছে? শুনলাম এবার নাকি ছুটিতে বাড়ি যাওনি?"
- "জ্বী, নানা ব্যস্ততার কারণে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।"
- "আচ্ছা, তোমার আর কোনো ভাই-বোন নেই?"
- "না, আমি আমার মায়ের একমাত্র সন্তান।"
- "তোমার মা কি গ্রামেই থাকেন?"
- "জ্বী।"
- "তোমার মা গ্রামে একা কীভাবে থাকেন?"
কথা বলল না ফ্রেড। কিভাবে সে জনকে নিজের মনের কথাগুলো বলবে? জীবনে সে অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে আজ এতদূর এসেছে। আর এসময় তার পাশে বন্ধুর মতো পাশে থেকেছে তার মা। সে বাবার মুখ দেখেনি, তার চাচারা ছাড়া আর সবাই তাকে আর তার মাকে পরিত্যাগ করেছিল। কিন্তু তাতেও ফ্রেডের কিছু যায় আসেনি। একজন এতিম ছেলের মা-ই তার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু কে জানত একদিন তাকে তাও হারাতে হবে!
ফ্রেডের নীরবতা ছিল লক্ষ করার মতো। জন বলল, "একটা সময় ছিল যখন আমি প্রতিদিন গ্রামে যেতাম শুধুমাত্র গ্রামের প্রকৃতি দেখার জন্য। এটা নিয়ে আমার ভাইরা আমার সাথে টিটকারি করত। বাবাও আমাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলেন। বাবার ইচ্ছা, আমি যেন একজন বড় উকিল হই। তিনি বড় ছেলেকে তার মতো পলিটিক্সের সাথে জড়িত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের জোরে আমিই হলাম রাজনীতিবিদ আর সে হলো উকিল। আমি তখনো ভাবিনি জীবনে বড় হয়ে ঠিক কি করব। জীবনের লক্ষ্য বলে যে কিছু আছে, তখন তা মাথাতেই আসত না। যখনই সময় পেতাম গ্রামে যেতাম, আর অপলক চোখে তাকিয়ে থাকতাম প্রকৃতির দিকে। যখন হাইস্কুলে উঠলাম তখন চারিদিকে হঠাৎ ভাঙনের ধ্বনি শুনতে পেলাম। একে একে সব রাজ্যগুলো ভাগ হতে লাগল। বাবা অনেক চেষ্টা করেও মন্ত্রীসভাকে টিকিয়ে রাখতে পারলেন না, রাজ্যপ্রধানগণ একে একে নিজেদের পদত্যাগপত্র জমা দিতে লাগল অথবা নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কেউ কেউ বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দিল। বাবা আমাদের সকলকে গ্রামে রেখে এলেন। আমরা তিনভাই আর মা - বেশ ভালই কাটছিল দিনগুলি। হঠাৎ একদিন গ্রামে আমার এক পরিচিত লোকের কাছে শুনতে পেলাম প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ বিদ্রোহীরা ঘিরে ফেলেছে। আমি দিক-বিদিক হারিয়ে রওয়ানা দিলাম রাজধানীর দিকে, যাবার সময় মা কিংবা ভাইদের বলার সুযোগও পেলাম না। রাজধানীতে গিয়ে শুনতে পেলাম, বাবা আর বেঁচে নেই। বাবাকে শেষ বারের মতোও দেখার সুযোগ পেলাম না। আমি যখন প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছে গেলাম, তখন মিথুনিয়ার তৎকালীন ও শেষ মেয়র আমাকে তাড়াতাড়ি করে তার বাসায় নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন যে আমার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যাওয়া মোটেও নিরাপদ নয়। তারা প্রেসিডেন্টকে মেরেছে, এখন তারা প্রেসিডেন্টের বংশ নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। আমি তাকে আমার মা ও ভাইদের কথা বললাম। তিনি একজন লোক পাঠিয়ে দিলেন আমার মা ও ভাইদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় নি। তারা আমার মা ও মেজভাইকে মেরে ফেলে। বড় ভাই পালিয়ে যায়। মাকেও শেষবারের জন্য দেখার সৌভাগ্য আমার হয়ে ওঠেনি। বড়ভাইকে প্রায় ১০ বছর ধরে খুঁজে বেড়িয়েছি, পাইনি।" একটা দীর্ঘশ্বাস নিল জন। "এটা আজ হতে প্রায় ৩০ বছর আগের ঘটনা। এই ৩০ বছরে কত পরিবর্তন এসেছে! আগে যে বাবা ছিলেন একজন দেশদ্রোহী, তিনি নিমেষে হয়ে গেলেন শহিদ। আদালত প্রায় জোর করে আমাদের এই পুরনো বাড়িটাতে আমাকে থাকার অনুমতি দিল। মিথুনিয়ার সাবেক মেয়রের অনুপ্রেরণায় আমি রাজনীতিতে প্রবেশ করি এবং আজ অবধি এ পথেই আছি। জীবনটা আসলে অনেক কমসময়ের জন্য। এখন বয়স চল্লিশ পার হয়ে গেলো। আর ক'দিনই বা বাঁচব! কম সময় হলেও বড় বিচিত্র এ জীবন! কত অভিজ্ঞতা, কত আনন্দ, বেদনা, কত পাওয়া, না পাওয়া! কিন্তু এ সবকিছুর পেছনে উদ্দেশ্য কি?" থামল জন।
জন থামলেও ফ্রেড কোন কথা বলল না। কি বলবে সে? বলার তো তার কিছুই নেই। সে এতদিন ভাবত যত দুঃখ-বেদনা সব যেন শুধুই তার। কিন্তু তার এ দাবী যে মোটেও সঠিক নয় তা সে আজ বুঝতে পেল। এ জীবনের কী উদ্দেশ্য? - অন্য সবার মতো তারও মাঝে এ প্রশ্ন খেলা করে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের মত সেও ভুলে যায় কোন জগতে সে বাস করছে।
আজ পিটারসন মেমোরিয়ালের পাশ দিয়ে যাবার সময় ফ্রেড পুলারের লেখা বই "হারানো স্বাধীনতা"র প্রথম খণ্ড কিনে নিয়ে গেল। জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার জন্য বোধ হয় এর চাইতে কোনো ভাল বই এ গ্রহে নেই।
অসম্ভবঃ পাঁচ
ডায়রী লিখতে বসেছে ফ্রেড। ডায়রী লেখার অভ্যাসটা ফ্রেডের আগে ছিল না। মাস
দুয়েক আগে কেন জানি তার মনের মধ্যে উদয় হলো যে ডায়রী লেখা দরকার। ব্যাস,
অমনি বাজার থেকে একটা ডায়রী কিনে নিয়ে এলো সে। সপ্তাহ দুয়েক থেকে তার কলেজ
বন্ধ: "শরৎকালীন অবকাশ"।
অনেক চেষ্টা করেও সে আজকে কি বার - তা বের করতে পারল না। ভাবল, ড্যানকে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো তার যে ড্যান বাড়ি চলে গেছে। আসলে, সবাই বাড়ি চলে গেছে, শুধু সে একাই আছে। যেন গোটা হল কয়েকদিনের জন্য তার নিজের হয়ে গেছে। হঠাৎ নিজেকে বড্ড একা মনে হলো তার। মনে পড়ল তার মায়ের কথা, কতদিন থেকে যে সে বাড়ি যায় না - তার হয়তো কোনো সঠিক হিসেব সে দিতে পারবে না। কেনই বা সে বাড়ি যাবে? ওই বাড়ি কি এখনো তার নিজের আছে? মাস ছয়েক আগে তার মা তাকে চিঠি পাঠিয়েছিল যে তিনি আর ফ্রেডের খরচ বহন করতে পারবেন না, কে জানত যে তা তিনি করেছেন নিজের ছেলেকে পর করার জন্য।
সত্য কথাটা ফ্রেড জানতে পেরেছে মাস চারেক আগে তার বড় চাচার মাধ্যমে: তার মা আরেকটা বিয়ে করেছেন। এটা শুনে একেবারে ভেঙে পড়েছিল সে। তার বাবা মারা যাবার পর দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর তার মা বিধবা থেকেছেন, এখন জীবনের শেষ সময়ে এসে তাঁকে কেন নতুন করে বিয়ে করতে হলো তা তার মাথায় আসে না। তিনি তো তার শ্বশুরালয়ে মন্দ ছিলেন না। তাঁকে তারা এমনকি রান্না করার কাজটিও করতে দিতেন না। মানুষ সত্যি নিজের সুখ বুঝতে পারে না। তার চাচা অবশ্য তাকে বলেছিল যে, সে চাইলে তিনি তাকে প্রতিমাসে টাকা পাঠাতে পারবেন। সে জবাব দেয় যে দরকার হলে সে অবশ্যই চাইবে। কিন্তু মনে মনে চিন্তা করে সে, কোন মুখে সে তার চাচার কাছে সাহায্য চাইবে যখন তার মা এমন একটি কাজ করে বসল।
ফ্রেড চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আজ তার আর ডায়রী লেখা হলো না, যেতে হবে টিউশনিতে। জন অবশ্য বলেছিল যে চাইলে সে ছুটি নিতে পারে। কিন্তু সে ছুটি নেয়নি। ছুটি নিয়ে তার কি হবে? তার তো আর কোনো বাড়ি নেই। আগে তার মা রোজ তার কাছে চিঠি লিখত কিন্তু নতুন বিয়ের পর ওটাই ছিল তার শেষ চিঠি। একজন মা কি করে এমন পাল্টাতে পারে ফ্রেড বুঝতে পারে না।
তাড়াতাড়ি করে শার্টটা পাল্টিয়ে রওনা হলো সে। জগতের মানুষগুলো বড়ই অদ্ভুত। তারা শুধু ছুটছে আর ছুটছে, কিন্তু কোন দিকে ছুটছে, কেন ছুটছে, তা তাদের অনেকেরই অজানা। আর যে সামান্য সংখ্যক মানুষ জানে তারাও অনেকে না জানার ভান করে থাকে। মানবজাতির এ দুরবস্থার জন্য কষ্ট পায় ফ্রেড। ড্যান অবশ্য তাকে বলে যে শুধু কষ্ট পেলেই চলবে না, এ দুরবস্থা থেকে মানবজাতির মুক্তির জন্য কাজ করতে হবে। কিন্তু সে একা কীভাবে এতবড় দায়িত্ব পালন করতে পারবে? এজন্য তো প্রয়োজন দলবদ্ধ প্রচেষ্টা। এই কথাটা অবশ্য সে ড্যানকে বলে না, কারণ সবকিছুতেই রাজনীতিকে টেনে আনা ড্যানের একটা বদ অভ্যাস। হ্যাঁ, সে এটা নিজেও স্বীকার করে যে রাজনীতি ছাড়া দেশ অচল। কিন্তু তাই বলে তো আর সবখানে রাজনীতি চলে না! সব কিছুরই তো একটা সীমা থাকা উচিত। সে অন্ততঃ ছাত্রজীবনে রাজনীতি থেকে বিরত থাকবে - এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে যদিও ইদানিং তার ভয় হয় যে সে হয়ত ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়বে। সে এ ব্যাপারে আরো সাবধান হতে চেষ্টা করছে।
না, আজকে তার বোধ হয় একটু দেরিই হয়ে গেল। সন্ধা নেমে আসছে, অথচ আজ তার যাবার কথা ছিল বিকেলে। আজই প্রথমবারের মতো সে পিটারসন মেমোরিয়ালের পাশ দিয়ে যাবার সময় পিটারসনের মূর্তির দিকে একবারও তাকাল না।
অনেক চেষ্টা করেও সে আজকে কি বার - তা বের করতে পারল না। ভাবল, ড্যানকে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো তার যে ড্যান বাড়ি চলে গেছে। আসলে, সবাই বাড়ি চলে গেছে, শুধু সে একাই আছে। যেন গোটা হল কয়েকদিনের জন্য তার নিজের হয়ে গেছে। হঠাৎ নিজেকে বড্ড একা মনে হলো তার। মনে পড়ল তার মায়ের কথা, কতদিন থেকে যে সে বাড়ি যায় না - তার হয়তো কোনো সঠিক হিসেব সে দিতে পারবে না। কেনই বা সে বাড়ি যাবে? ওই বাড়ি কি এখনো তার নিজের আছে? মাস ছয়েক আগে তার মা তাকে চিঠি পাঠিয়েছিল যে তিনি আর ফ্রেডের খরচ বহন করতে পারবেন না, কে জানত যে তা তিনি করেছেন নিজের ছেলেকে পর করার জন্য।
সত্য কথাটা ফ্রেড জানতে পেরেছে মাস চারেক আগে তার বড় চাচার মাধ্যমে: তার মা আরেকটা বিয়ে করেছেন। এটা শুনে একেবারে ভেঙে পড়েছিল সে। তার বাবা মারা যাবার পর দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর তার মা বিধবা থেকেছেন, এখন জীবনের শেষ সময়ে এসে তাঁকে কেন নতুন করে বিয়ে করতে হলো তা তার মাথায় আসে না। তিনি তো তার শ্বশুরালয়ে মন্দ ছিলেন না। তাঁকে তারা এমনকি রান্না করার কাজটিও করতে দিতেন না। মানুষ সত্যি নিজের সুখ বুঝতে পারে না। তার চাচা অবশ্য তাকে বলেছিল যে, সে চাইলে তিনি তাকে প্রতিমাসে টাকা পাঠাতে পারবেন। সে জবাব দেয় যে দরকার হলে সে অবশ্যই চাইবে। কিন্তু মনে মনে চিন্তা করে সে, কোন মুখে সে তার চাচার কাছে সাহায্য চাইবে যখন তার মা এমন একটি কাজ করে বসল।
ফ্রেড চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আজ তার আর ডায়রী লেখা হলো না, যেতে হবে টিউশনিতে। জন অবশ্য বলেছিল যে চাইলে সে ছুটি নিতে পারে। কিন্তু সে ছুটি নেয়নি। ছুটি নিয়ে তার কি হবে? তার তো আর কোনো বাড়ি নেই। আগে তার মা রোজ তার কাছে চিঠি লিখত কিন্তু নতুন বিয়ের পর ওটাই ছিল তার শেষ চিঠি। একজন মা কি করে এমন পাল্টাতে পারে ফ্রেড বুঝতে পারে না।
তাড়াতাড়ি করে শার্টটা পাল্টিয়ে রওনা হলো সে। জগতের মানুষগুলো বড়ই অদ্ভুত। তারা শুধু ছুটছে আর ছুটছে, কিন্তু কোন দিকে ছুটছে, কেন ছুটছে, তা তাদের অনেকেরই অজানা। আর যে সামান্য সংখ্যক মানুষ জানে তারাও অনেকে না জানার ভান করে থাকে। মানবজাতির এ দুরবস্থার জন্য কষ্ট পায় ফ্রেড। ড্যান অবশ্য তাকে বলে যে শুধু কষ্ট পেলেই চলবে না, এ দুরবস্থা থেকে মানবজাতির মুক্তির জন্য কাজ করতে হবে। কিন্তু সে একা কীভাবে এতবড় দায়িত্ব পালন করতে পারবে? এজন্য তো প্রয়োজন দলবদ্ধ প্রচেষ্টা। এই কথাটা অবশ্য সে ড্যানকে বলে না, কারণ সবকিছুতেই রাজনীতিকে টেনে আনা ড্যানের একটা বদ অভ্যাস। হ্যাঁ, সে এটা নিজেও স্বীকার করে যে রাজনীতি ছাড়া দেশ অচল। কিন্তু তাই বলে তো আর সবখানে রাজনীতি চলে না! সব কিছুরই তো একটা সীমা থাকা উচিত। সে অন্ততঃ ছাত্রজীবনে রাজনীতি থেকে বিরত থাকবে - এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে যদিও ইদানিং তার ভয় হয় যে সে হয়ত ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়বে। সে এ ব্যাপারে আরো সাবধান হতে চেষ্টা করছে।
না, আজকে তার বোধ হয় একটু দেরিই হয়ে গেল। সন্ধা নেমে আসছে, অথচ আজ তার যাবার কথা ছিল বিকেলে। আজই প্রথমবারের মতো সে পিটারসন মেমোরিয়ালের পাশ দিয়ে যাবার সময় পিটারসনের মূর্তির দিকে একবারও তাকাল না।
অসম্ভবঃ চার
জনের নাতিকে পড়িয়ে ফ্রেড কলেজের হোস্টেলে ফিরছে। জনের বাড়ীটা তার হোস্টেল
থেকে বেশী দূরে নয়। সে ভেবে পায়নি জন এরকম একটি জায়গায় কিভাবে থাকার জায়গা
পেল। পরে অবশ্য ড্যান তাকে বলেছে যে, জনকে ঐ বাড়ীতে থাকার অনুমতি তাকে
আদালতই দিয়েছে। কেন দিয়েছে জিজ্ঞেস করলে ড্যান জবাব দেয় যে, এদেশের
স্বাধীনতায় জনের বাবার বিশেষ ভুমিকা ছিল। তারই প্রতি সন্মান প্রদর্শন করে
আদালত তাকে ঐ বাড়ীতে থাকতে দিয়েছে। ফ্রেড বলে, জনের বাবা দেশের জন্য
লড়েছেন, ভালো কথা; কিন্তু তার এই মহৎ কাজের জন্য তার পরিবারকে দেশের
কেন্দ্রস্থলে থাকার জায়গা দিতে হবে - এটা তো ঠিক নয়। এর অর্থ কি এই দাঁড়ায়
না যে, জন তার বাবার মহৎ কর্মকে নিয়ে ব্যবসা করছে অথবা রাষ্ট্র জনের বাবার
মহৎ কর্মের মূল্য - যা কিনা কখনোই কোনো কিছু দ্বারা শোধ করার নয় - পরিশোধ
করার চেষ্টা করছে? ড্যান জবাবে কোনো উত্তর দেয় না, চুপ করে থাকে সে।
মানুষের চিন্তা-ভাবনাগুলো যখন খুবই স্বচ্ছ হয় তখন আসলে তাতে মৌন সম্মতি
দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না, বিশেষ করে তা যখন শোনা যায় সাধারণ কোনো
মানুষের মুখ থেকে। কয়েকমিনিট চুপ থেকে ড্যান বলে, সত্যি কথা বলতে কি, এই
জগতে সবার দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়; বিভিন্ন মানুষ বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন উপায়ে
চিন্তা করে। তাই এই সমাজে যে একটা সামান্য ব্যাপারেও অনেক মত থাকবে - এটাই
স্বাভাবিক। ফ্রেড বুঝতে পারে না ড্যান কি বোঝাতে চাচ্ছে। সে বলে, তা ঠিক।
কিন্তু সমাজের কি উচিত নয় এসব দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে সবচাইতে ভালো মতটি গ্রহণ
করা? অবশ্যই, জবাব দেয় ড্যান। তবে এখানেও কিছু সমস্যা রয়েছে। সমাজ তো কোনো
বিবেচক নয় যে সে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মতামতটি গ্রহণ করবে। বরং
এটা সমাজের মানুষদের নিজেদেরই দায়িত্ব, অন্যকথায় বলা যায়, সমাজের
নীতি-নির্ধারকদের দায়িত্ব। কিন্তু আমাদের সমাজের নীতি-নির্ধারকরা তা করছেন
না। ড্যানের কথা শেষ হলে ফ্রেড বলে, হ্যাঁ, কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ,
তারা কেন এমনটি করছেন না? ভেবেছি, অনেক ভেবেছি, কিন্তু কোনো কূল পাইনি।
হয়তো তারা নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় বলেই এমনটা করে। জবাব দেয়
ড্যান। স্বার্থ? হ্যাঁ, স্বার্থই এর পেছনে মুখ্য ভুমিকা পালন করে। এই
জিনিসটা না থাকলে হয়তো এ জগৎ একটা সুন্দর জায়গায় পরিণত হত। এজগতে পাশাপাশি
অবস্থান করেও একজন মানুষ আরেকজনকে চিনতে পারে না এই স্বার্থের কারণেই। বলে
ফ্রেড। পিটারসন মেমরিয়ালের সামনে দিয়ে যাবার সময় প্রতিদিন তার এই একটি
জিনিসই মনে হয়। কোনো এককালে এ জগতে বাস করতো এক ভয়ঙ্কর প্রাণী, তাদেরই মধ্য
থেকে একজন এগিয়ে আসে তাদেরকেই ধ্বংস করতে সাহায্য করার জন্য, আর সেই
ব্যক্তিটি ছিলেন পিটারসন। লোকটির ছবি দেখে ফ্রেডের কাছে মানুষের মতোই মনে
হয়। কিন্তু তিনি মানুষ ছিলেন না, ছিলেন মাস্কারাস - সেই ভয়ংকর প্রাণীদের
বংশধর যাদের কথা শুনলে একসময় মানুষ ভয়ে কেঁপে উঠত। সে সবচাইতে অবাক হয় এটা
ভেবে যে মানুষ সে সময় একত্রে বাস করত, আর তখন এ দেশ ছিল গোটা মানবজাতির
প্রতিনিধিত্বকারী, মিথুনিয়া - হ্যাঁ, একদিন এদেশের নাম ছিল মিথুনিয়া, এখন
তা থেকে হয়েছে 'সোমার'। জাতীয়তাবাদ এ গ্রহকে যে ভাঙন ছাড়া আর কি উপহার দিল -
তা ফ্রেডের মাথ্য আসে না। ইতিহাস থেকে মানুষ যে আদৌ কিছু শেখে না তা তো আজ
দিনের আলোর মতো পরিষ্কার! সে পিটারসন মেমোরিয়ালের বাইরে দাঁড় করানো
পিটারসনের বিশাল মূর্তিটা থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে জোর পায়ে এগিয়ে চলল তার
হোস্টেলের দিকে।
অসম্ভবঃ তিন
দেখতে দেখতে কিভাবে যে একমাস কেটে গেল, ফ্রেড টেরই পেল না। সোমারে এখন
বর্ষাকাল। প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হয় এসময়।এমনি এক বর্ষণমুখর সন্ধায় তার
বিছানায় বসে পাশের জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিল। ড্যান তার বিছানায় শুয়ে শুয়ে
বই পড়ছিল। নাহ, ক্লাসের পড়া নয়। উপন্যাস পড়ছে সে।
সে ড্যানের দিকে তাকাল। বলল, "একটা জিনিস আমার জানা ছিল না।"
-"কি?"
-"রাজনীতিকরাও উপন্যাস পড়ে!"
-"রাজনীতিকরা সব পড়ে। একটা দলকে নেতৃত্ব দিতে চাইলে; একটা দেশ পরিচালনা করতে গেলে শুধু যোগ্যতা থাকলে হয় না অনেক কিছু জানতেও হয়।"
-"এত জেনে কি লাভ হয় বল? একবার ক্ষমতায় যেতে পারলে তো সবাই দুর্নীতিতে শীর্ষে চলে যায়।"
-"সবাই কি একরকম হয়, বল? কেউ নিজের জ্ঞানকে ভালো কাজে লাগায়, আবার কেউবা খারাপ কাজে - এটাই তো জগতের নিয়ম।"
-"জগতের নিয়ম! জগত নিজে নিজে নিয়ম সৃষ্টি করতে পারে নাকি?"
-"জগত হয়তো পারেনা; কিন্তু স্রষ্টা তো পারেন।"
-"তাহলে এর অর্থ কি এটা হচ্ছেনা যে, স্রষ্টাই আমাদের দিয়ে এসব করাচ্ছেন?"
-"হ্যাঁ, অনেকটা তাই।"
-"কেন তিনি এমন করছেন?"
-"এর সঠিক জবাব আমার কাছে নেই। তাঁর জগত পরিচালনার এ নীতি আমার কাছে বড় অদ্ভুত লাগে।"
-"কারণ তুমি শুরুতেই ভুল করেছ।"
-"কীভাবে?"
-"স্রষ্টা আমাদের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন; এবং তিনিই আমাদের ভালোমন্দ নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছেন। কাজেই এটা জগতের কোনো নীতি নয়; এটা আমাদের তৈরী করা নীতি।এবং আমাদের এই নীতি তৈরি করার পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে। তবে এর মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে কারণটি তা হলঃ আমরা এই দুর্নীতি, কু-নীতির মাঝে বসবাস করতে করতে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি । আর এই হতাশা থেকে মুক্তি পেতে খোদ এই কাজকর্ম গুলোকেই 'জগতের নিয়ম' বানিয়ে দিয়েছি।"
-"তা ঠিক । কিন্ত সমাজের প্রতিটি শিরায় শিরায় বয়ে চলা এই দুর্নীতি, কু-নীতি থেকে সমাজকে বাঁচানোর এ গুরু দায়িত্ব নেবে কে?"
-"এই সমস্যার মুকাবিলা করা একার পক্ষে অসম্ভব; এজন্য চাই সামষ্টিক উদ্যোগ।"
-"আর এজন্য দরকার একটি আদর্শবাদী সামাজিক-রাজনৈতিক দল, নয় কি?"
-"তুমি ঠিক বলেছ। এ সমস্যা সমাধান করতে চাইলে শুধুমাত্র একটা আদর্শবাদী সামাজিক সংস্থা বা দল যথেষ্ঠ নয়; একটা আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দলও অত্যন্ত জরুরী।"
-"তাহলে সব জেনেশুনেও তুমি রাজনীতি করছ না কেন?"
-"কারণটা এর আগেও অনেকবার বলেছি এবং আজও বলছিঃ আমি নিজেকে রাজনীতিতে জড়াতে চাচ্ছিনা কারণ এ দেশে রাজনৈতিকভাবে আদর্শিক কোনো দল নেই।"
-"কেন? 'জনফ্রন্ট'কে কি তোমার কোনো আদর্শিক দল মনে হয় না?"
-"হ্যাঁ, তারা তাদের দলীয় ব্যাপারে আদর্শিক- কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু দলীয় আদর্শ ও রাজনৈতিক আদর্শ মোটেও এক জিনিস নয়।"
-"তাহলে আমরা দেশ পরিচালনা করছি কিভাবে?"
-"দলীয় আদর্শ দিয়ে। একারণেই তো তোমাদের দলীয় লোকজন সব জায়গায় অন্যান্যদের চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে, পাচ্ছেনা কি?"
-"মানলাম এদেশে রাজনৈতিকভাবে আদর্শিক কোনো দল নেই। আর এ জন্য তুমি দর্শক হয়ে শুধু বসে বসে দেখবে?"
-"এছাড়া আর কি উপায় আছে বল? আমি একজন সামান্য মানুষ। রাজনৈতিক সংস্কার আমার দ্বারা কি আর সম্ভব?"
-"কেন সম্ভব নয়? চেষ্টা থাকলে সব সম্ভব- এটা তো তুমি রোজই বল।"
-"কিন্তু একটা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা কোনো ছেলে খেলা নয়। যে কেউ চাইলে তা পারে না।"
-"এখানে আবার রাজনৈতিক দল গড়ার কথা কে বলল?"
-"তার মানে তুমি বলতে চাও যে একটা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের মাঝে থেকে সেই দলকে একটি আদর্শবাদী দলে পরিণত করা?"
-"ঠিক তাই।"
-"কিন্তু এটা করতে গেলে এমনও তো হতে পারে যে আমি নিজেই তাদের আদর্শের ফাঁদে পড়ে গেলাম।"
-"তীব্র প্রচেষ্টা আর দৃঢ় ইচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ইতিহাস বইয়ে পড়নি পিটারসন একজন এলিয়েন বংশদ্ভুত হয়েও আমাদের কীভাবে সাহায্য করেছিলেন এ গ্রহ থেকে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্যে?"
ফ্রেড ড্যানের প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না। সে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল জানালার বাইরে। বাইরে এখনও অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে।
সে ড্যানের দিকে তাকাল। বলল, "একটা জিনিস আমার জানা ছিল না।"
-"কি?"
-"রাজনীতিকরাও উপন্যাস পড়ে!"
-"রাজনীতিকরা সব পড়ে। একটা দলকে নেতৃত্ব দিতে চাইলে; একটা দেশ পরিচালনা করতে গেলে শুধু যোগ্যতা থাকলে হয় না অনেক কিছু জানতেও হয়।"
-"এত জেনে কি লাভ হয় বল? একবার ক্ষমতায় যেতে পারলে তো সবাই দুর্নীতিতে শীর্ষে চলে যায়।"
-"সবাই কি একরকম হয়, বল? কেউ নিজের জ্ঞানকে ভালো কাজে লাগায়, আবার কেউবা খারাপ কাজে - এটাই তো জগতের নিয়ম।"
-"জগতের নিয়ম! জগত নিজে নিজে নিয়ম সৃষ্টি করতে পারে নাকি?"
-"জগত হয়তো পারেনা; কিন্তু স্রষ্টা তো পারেন।"
-"তাহলে এর অর্থ কি এটা হচ্ছেনা যে, স্রষ্টাই আমাদের দিয়ে এসব করাচ্ছেন?"
-"হ্যাঁ, অনেকটা তাই।"
-"কেন তিনি এমন করছেন?"
-"এর সঠিক জবাব আমার কাছে নেই। তাঁর জগত পরিচালনার এ নীতি আমার কাছে বড় অদ্ভুত লাগে।"
-"কারণ তুমি শুরুতেই ভুল করেছ।"
-"কীভাবে?"
-"স্রষ্টা আমাদের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন; এবং তিনিই আমাদের ভালোমন্দ নির্বাচনের সুযোগ দিয়েছেন। কাজেই এটা জগতের কোনো নীতি নয়; এটা আমাদের তৈরী করা নীতি।এবং আমাদের এই নীতি তৈরি করার পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে। তবে এর মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে কারণটি তা হলঃ আমরা এই দুর্নীতি, কু-নীতির মাঝে বসবাস করতে করতে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি । আর এই হতাশা থেকে মুক্তি পেতে খোদ এই কাজকর্ম গুলোকেই 'জগতের নিয়ম' বানিয়ে দিয়েছি।"
-"তা ঠিক । কিন্ত সমাজের প্রতিটি শিরায় শিরায় বয়ে চলা এই দুর্নীতি, কু-নীতি থেকে সমাজকে বাঁচানোর এ গুরু দায়িত্ব নেবে কে?"
-"এই সমস্যার মুকাবিলা করা একার পক্ষে অসম্ভব; এজন্য চাই সামষ্টিক উদ্যোগ।"
-"আর এজন্য দরকার একটি আদর্শবাদী সামাজিক-রাজনৈতিক দল, নয় কি?"
-"তুমি ঠিক বলেছ। এ সমস্যা সমাধান করতে চাইলে শুধুমাত্র একটা আদর্শবাদী সামাজিক সংস্থা বা দল যথেষ্ঠ নয়; একটা আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দলও অত্যন্ত জরুরী।"
-"তাহলে সব জেনেশুনেও তুমি রাজনীতি করছ না কেন?"
-"কারণটা এর আগেও অনেকবার বলেছি এবং আজও বলছিঃ আমি নিজেকে রাজনীতিতে জড়াতে চাচ্ছিনা কারণ এ দেশে রাজনৈতিকভাবে আদর্শিক কোনো দল নেই।"
-"কেন? 'জনফ্রন্ট'কে কি তোমার কোনো আদর্শিক দল মনে হয় না?"
-"হ্যাঁ, তারা তাদের দলীয় ব্যাপারে আদর্শিক- কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু দলীয় আদর্শ ও রাজনৈতিক আদর্শ মোটেও এক জিনিস নয়।"
-"তাহলে আমরা দেশ পরিচালনা করছি কিভাবে?"
-"দলীয় আদর্শ দিয়ে। একারণেই তো তোমাদের দলীয় লোকজন সব জায়গায় অন্যান্যদের চেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে, পাচ্ছেনা কি?"
-"মানলাম এদেশে রাজনৈতিকভাবে আদর্শিক কোনো দল নেই। আর এ জন্য তুমি দর্শক হয়ে শুধু বসে বসে দেখবে?"
-"এছাড়া আর কি উপায় আছে বল? আমি একজন সামান্য মানুষ। রাজনৈতিক সংস্কার আমার দ্বারা কি আর সম্ভব?"
-"কেন সম্ভব নয়? চেষ্টা থাকলে সব সম্ভব- এটা তো তুমি রোজই বল।"
-"কিন্তু একটা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা কোনো ছেলে খেলা নয়। যে কেউ চাইলে তা পারে না।"
-"এখানে আবার রাজনৈতিক দল গড়ার কথা কে বলল?"
-"তার মানে তুমি বলতে চাও যে একটা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের মাঝে থেকে সেই দলকে একটি আদর্শবাদী দলে পরিণত করা?"
-"ঠিক তাই।"
-"কিন্তু এটা করতে গেলে এমনও তো হতে পারে যে আমি নিজেই তাদের আদর্শের ফাঁদে পড়ে গেলাম।"
-"তীব্র প্রচেষ্টা আর দৃঢ় ইচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ইতিহাস বইয়ে পড়নি পিটারসন একজন এলিয়েন বংশদ্ভুত হয়েও আমাদের কীভাবে সাহায্য করেছিলেন এ গ্রহ থেকে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্যে?"
ফ্রেড ড্যানের প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না। সে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল জানালার বাইরে। বাইরে এখনও অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে।
অসম্ভবঃ দুই
জীবনের এই চরম মুহুর্তগুলো অনেকবার এসেছে ফ্রেডের জীবনে এবং প্রতিবারই
সে টিকে থেকেছে সাফল্যের সাথে, এরই নাম বোধহয় জীবন-যুদ্ধ, ভাবছিল ফ্রেড।
তার বাবা বহু আগেই তাদের ত্যাগ করেছে: মার কাছে সে বহুবার একথা শুনেছে,
কিন্তু তার বাবা এখন কোথায়, জীবিত কি মৃত - তা কোনোদিনও মা বলেনি তাকে। এসব
মনে হলে মায়ের ওপর খুব অভিমান হয় ফ্রেডের। বিশেষত একারণে যে তার মা আরেকটা
বিয়ে করেছে সে তার মায়ের পেটে থাকতেই।
ড্যানের ডাকে সে ঘুম থেকে জাগল। ভাবতে ভাবতে আজও সে পড়ার টেবিলে ঘুমিয়ে পড়েছে।
নাহ, ইদানিং যেন পড়াশুনায় আর মনই বসছে না!
"কিরে কি সিদ্ধান্ত নিলি?" জিজ্ঞেস করল ড্যান।
ফ্রেডের মনে পড়ল, জনের দেয়া টিউশনি সে করাবে কিনা তা আজ তাকে জানানোর কথা। ঠিক এ চিন্তাটাই সে করছিল কিন্তু হুট করে সব কেমনজানি এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল।
'জীবন-যুদ্ধ', হাসল সে।
-"কি ব্যাপার হাসছিস যে? আমি কি তোকে কোনো হাসির কথা বললাম নাকি?"
ফ্রেড হাসি থামিয়ে ড্যানের দিকে তাকাল। তারপর সে গম্ভিরমুখে বলল, "না, এমনিতেই হাসছিলাম।"
"টিউশনির ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নিলি?" পুনরায় জিজ্ঞেস করল ড্যান।
-"সিদ্ধান্ত? সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা যদি আমার থাকত তবে জনের সাথে দেখাই করতাম না। মানুষ যখন বেকায়দায় পড়ে তখন তার 'নিজের সিদ্ধান্ত' বলে আর কিছু থাকে না।"
-"থাকে, থাকে, তুই আসলে নিজেকে বড় অসহায় ভাবিস। দুনিয়ার সব মানুষই জীবনে কোনো না কোনো সময় কঠিন বাস্তবতার সন্মুখীন হয় এবং তারা অধিকাংশই তা জয় করে নেয়। "
-"তুমি তো কোনোদিন এর মাঝে পড়নি, যেদিন পড়বে সেদিন বুঝবে।"
হাসল ড্যান। বলল, "মানুষের লাইফস্টাইল দেখে কি সব কিছু বোঝা যায়?"
একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ড্যান আবার শুরু করল, "যাকগে ওসব কথা। আমি তাহলে জনকে বলে দিই যে তুমি তার প্রস্তাবে রাজী হয়েছ।"
বলেই সে ঘর হতে বেরিয়ে গেল।
ফ্রেড পিটারসন পার্কের একটা বেঞ্চে বসে আছে। জনের সাথে তার এখানে দেখা করার কথা। পার্কটা তার কলেজের একদম কাছে। কিন্তু সে একদিনও এখানে আসেনি। পার্কের পাশেই পিটারসন মেমরিয়াল। মেমরিয়ালের দুইটা গেট: একটা বাইরে থেকে, যা কিনা মূল ফটক এবং অপরটি পার্কের মধ্য দিয়ে। পার্কের মধ্য দিয়ে ঢোকার ফটকটির ওপরে পিটারসনের এক বিরাট ছবি।
ফ্রেড ছবিটার দিকে তাকিয়ে হাসছিল।
"তুমি যা ভাবছ মূল ঘটনা আসলে তা ছিল না।" বলতে বলতে জন এসে তার পাশে বসলেন।
-"তাহলে কি ছিল? পিটারসন এলিয়েনদের সাথে যুদ্ধ করেন নি?"
-"করেছিলেন এবং মজার ব্যাপার হলো তিনি নিজেও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।"
-"এগুলো তো রূপকথা।"
-"তোমার কাছে এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক। তুমি তো আর বইয়ের বাইরের ইতিহাস জান না।"
-"কেন? বইগুলোতে কি ভুল কিছু লেখা আছে?"
-"না নেই। তবে ইতিহাসের একটা বৈশিষ্ট্য কি জান? আংশিক ইতিহাস জেনে কোনোকিছুই যাচাই করা যায়না। তুমিও বুঝবে যেদিন আমাদের কাতারে আসবে।" থামল জন। তারপর আবার শুরু করলেন, "যাহোক, এখন কাজের কথায় আসা যাক। তুমি তাহলে আগামীকাল থেকে শুরু করছ।"
-"কিন্তু কাকে পড়াব তা তো এখন পর্যন্ত বলেন নি!"
-"আমার নাতিকে পড়াবে। ড্যান তোমাকে আমার ছেলের বাড়িতে নিয়ে যাবে।" থামল জন। তারপর আবার শুরু করলেন, "ওকে। তাহলে সে কথাই রইল। আমি তাহলে উঠি। জানই তো কত ব্যস্ততার মাঝে থাকতে হয়। মনে রেখ, ইতিহাস হলো এমন একটা জিনিস যা মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর যারা ইতিহাস বিমুখ তারা পেছনেই পড়ে থাকে। এখন হয়তো তুমি তা বুঝবে না। কিন্তু যখন তোমার জীবনের সব স্বপ্ন সত্যি হবে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে সেদিন বুঝবে, জীবনে স্বার্থকতা আসলে কোথায়। অবশ্য তখন সময় আর হয়তো থাকবে না নিজেকে শুধরিয়ে নেয়ার মতো। তবে যারা নিজেকে শুধরিয়ে নিতে পারে তারা হলো বিশ্বের সবচেয়ে সুখি মানুষদের একজন।" বলেই জন উঠে দাঁড়াল এবং দ্রুত পা বাড়াল পিটারসন মেমরিয়ালের ফটকের দিকে। ফ্রেড সেদিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর পার্কের বেঞ্চটার দুদিকে দু হাত প্রসারিত করে তাকিয়ে থাকল আকাশের দিকে।
ড্যানের ডাকে সে ঘুম থেকে জাগল। ভাবতে ভাবতে আজও সে পড়ার টেবিলে ঘুমিয়ে পড়েছে।
নাহ, ইদানিং যেন পড়াশুনায় আর মনই বসছে না!
"কিরে কি সিদ্ধান্ত নিলি?" জিজ্ঞেস করল ড্যান।
ফ্রেডের মনে পড়ল, জনের দেয়া টিউশনি সে করাবে কিনা তা আজ তাকে জানানোর কথা। ঠিক এ চিন্তাটাই সে করছিল কিন্তু হুট করে সব কেমনজানি এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল।
'জীবন-যুদ্ধ', হাসল সে।
-"কি ব্যাপার হাসছিস যে? আমি কি তোকে কোনো হাসির কথা বললাম নাকি?"
ফ্রেড হাসি থামিয়ে ড্যানের দিকে তাকাল। তারপর সে গম্ভিরমুখে বলল, "না, এমনিতেই হাসছিলাম।"
"টিউশনির ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নিলি?" পুনরায় জিজ্ঞেস করল ড্যান।
-"সিদ্ধান্ত? সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা যদি আমার থাকত তবে জনের সাথে দেখাই করতাম না। মানুষ যখন বেকায়দায় পড়ে তখন তার 'নিজের সিদ্ধান্ত' বলে আর কিছু থাকে না।"
-"থাকে, থাকে, তুই আসলে নিজেকে বড় অসহায় ভাবিস। দুনিয়ার সব মানুষই জীবনে কোনো না কোনো সময় কঠিন বাস্তবতার সন্মুখীন হয় এবং তারা অধিকাংশই তা জয় করে নেয়। "
-"তুমি তো কোনোদিন এর মাঝে পড়নি, যেদিন পড়বে সেদিন বুঝবে।"
হাসল ড্যান। বলল, "মানুষের লাইফস্টাইল দেখে কি সব কিছু বোঝা যায়?"
একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ড্যান আবার শুরু করল, "যাকগে ওসব কথা। আমি তাহলে জনকে বলে দিই যে তুমি তার প্রস্তাবে রাজী হয়েছ।"
বলেই সে ঘর হতে বেরিয়ে গেল।
ফ্রেড পিটারসন পার্কের একটা বেঞ্চে বসে আছে। জনের সাথে তার এখানে দেখা করার কথা। পার্কটা তার কলেজের একদম কাছে। কিন্তু সে একদিনও এখানে আসেনি। পার্কের পাশেই পিটারসন মেমরিয়াল। মেমরিয়ালের দুইটা গেট: একটা বাইরে থেকে, যা কিনা মূল ফটক এবং অপরটি পার্কের মধ্য দিয়ে। পার্কের মধ্য দিয়ে ঢোকার ফটকটির ওপরে পিটারসনের এক বিরাট ছবি।
ফ্রেড ছবিটার দিকে তাকিয়ে হাসছিল।
"তুমি যা ভাবছ মূল ঘটনা আসলে তা ছিল না।" বলতে বলতে জন এসে তার পাশে বসলেন।
-"তাহলে কি ছিল? পিটারসন এলিয়েনদের সাথে যুদ্ধ করেন নি?"
-"করেছিলেন এবং মজার ব্যাপার হলো তিনি নিজেও তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।"
-"এগুলো তো রূপকথা।"
-"তোমার কাছে এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক। তুমি তো আর বইয়ের বাইরের ইতিহাস জান না।"
-"কেন? বইগুলোতে কি ভুল কিছু লেখা আছে?"
-"না নেই। তবে ইতিহাসের একটা বৈশিষ্ট্য কি জান? আংশিক ইতিহাস জেনে কোনোকিছুই যাচাই করা যায়না। তুমিও বুঝবে যেদিন আমাদের কাতারে আসবে।" থামল জন। তারপর আবার শুরু করলেন, "যাহোক, এখন কাজের কথায় আসা যাক। তুমি তাহলে আগামীকাল থেকে শুরু করছ।"
-"কিন্তু কাকে পড়াব তা তো এখন পর্যন্ত বলেন নি!"
-"আমার নাতিকে পড়াবে। ড্যান তোমাকে আমার ছেলের বাড়িতে নিয়ে যাবে।" থামল জন। তারপর আবার শুরু করলেন, "ওকে। তাহলে সে কথাই রইল। আমি তাহলে উঠি। জানই তো কত ব্যস্ততার মাঝে থাকতে হয়। মনে রেখ, ইতিহাস হলো এমন একটা জিনিস যা মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর যারা ইতিহাস বিমুখ তারা পেছনেই পড়ে থাকে। এখন হয়তো তুমি তা বুঝবে না। কিন্তু যখন তোমার জীবনের সব স্বপ্ন সত্যি হবে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে সেদিন বুঝবে, জীবনে স্বার্থকতা আসলে কোথায়। অবশ্য তখন সময় আর হয়তো থাকবে না নিজেকে শুধরিয়ে নেয়ার মতো। তবে যারা নিজেকে শুধরিয়ে নিতে পারে তারা হলো বিশ্বের সবচেয়ে সুখি মানুষদের একজন।" বলেই জন উঠে দাঁড়াল এবং দ্রুত পা বাড়াল পিটারসন মেমরিয়ালের ফটকের দিকে। ফ্রেড সেদিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর পার্কের বেঞ্চটার দুদিকে দু হাত প্রসারিত করে তাকিয়ে থাকল আকাশের দিকে।
অসম্ভবঃ এক
[এটা নিছক একটা লেখা। কারো জীবন কাহীনির সাথে মিলে গেলে তা অলৌকিক ছাড়া আর কিছু নয়]
পৃথিবী নামে পরিচিত গ্রহ থেকে ২০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এক গ্রহের বাসিন্দা হলো ফ্রেড। সে সবে মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেছে। খুবই ভালো ছাত্র সে। জীবনে সে এক রোল ছাড়া দুই রোল করে নি। সে যে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়ে, তা তার দেশের সব চেয়ে বিখ্যাত একটা প্রতিষ্ঠান। সে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির একজন ছাত্র।
সে যে দেশে থাকে সে দেশের নাম 'সোমার'। তার পৃথিবীতে সব চেয়ে ছোট রাষ্ট্র এটা।
ফ্রেড বড় হয়ে অর্থনীতিবিদ হতে চায়। গরিব ঘরের সন্তান ফ্রেড অনেক কষ্টে এতদূর উঠেছে, অনেক দুঃখ-কষ্ট সে নিরবে মাথা পেতে নিয়েছে, আজ সে প্রতিষ্ঠার দ্বার প্রান্তে উন্নিত হয়েছে।
তার বিশ্ববিদ্যালয়ের যে হলে সে থাকে সেখানে তার একজন রুমমেটও রয়েছে। তার রুমমেটের নাম হলো ড্যান। সে ছাত্র রাজনীতির সাথে বিশেষভাবে জড়িত। সে মাঝে মাঝে ফ্রেডকে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বুঝাতে চেষ্টা করে; কিন্তু সে কানেই নেয় না। তার সামনে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে, তা বাদ দিয়ে সে রাজনীতি করবে! এটা তার মতো কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়া ব্যক্তির কাছে কতকটা নির্মমও ঠেকে।
সারাদিন ফ্রেড পড়াশুনা করে, নিয়মিত ক্লাশ করে, আর অবসর পেলে তার স্বপ্ন নিয়ে ভাবে। অর্থনীতিবিদ হয়ে গ্রামের সবার তাচ্ছিল্লের জবাব দিবে। ভাবতে ভাবতে অনেকসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে। তার রুমমেট এসে তাকে জাগায়।
একদিন একটা চিঠি এল। চিঠিটা তার মায়ের লেখা। চিঠিতে তার মা লিখেছেন যে তার পক্ষে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ যোগান দেয়া সম্ভব নয়। তাকে এখন নিজের খরচ নিজেকেই চালাতে হবে। তার মাথায় যেন বাজ পড়ল। অর্থাভাবে তার অর্থনীতি পড়ার স্বপ্নই না আজ ভেস্তে যায়! তার রুমমেট তার দিকে তাকাল, বলল, "কোনো সমস্যা নাকি, দোস্ত? থাকলে খালি আমাকে বল্। নিমিষেই সমাধান করে দেব।"
ফ্রেড হাসি হাসি ভাব করে বলল, "না, কোনো সমস্যা নাই। বাড়ীর কথা মনে পড়ছিল- এই আর কি!"
প্রকৃত ঘটনা সে নিজের কাছেই রাখল।
একদিন, দুইদিন, তিনদিন- এভাবে সারা মাস চলে গেল। কিন্তু ফ্রেড কোন টিউশনি বা পার্ট-টাইম চাকরী পেতে ব্যর্থ হলো। অবশেষে সে তার রুমমেট ড্যানকে সব কিছু খুলে বলল। তার বন্ধুবর বলল, "ও, এই তাহলে ঘটনা। আমাকে আগে বলবি তো। আমার সাথে চল, আমি তোর ব্যবস্থা করছি।"
ড্যান তাকে নিয়ে গেলো এক ভদ্রলোকের কাছে। লোকটির মুখে দাঁড়ি ভর্তি। সব চুল সাদা। চোখে কালো চশমা।
ড্যান তার কাছে গিয়ে বলল, "এই সেই রুমমেট যার কথা আমি আপনাকে বলেছিলাম।"
লোকটি ফ্রেডকে লক্ষ করে বললেন, "বস বাবা, বস।" তিনি তার দিকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন।
ফ্রেড সন্দেহসূচক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
লোকটা ফ্রেডের দিকে তখনো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েই ছিলেন। ফ্রেড বসতেই তিনি বললেন, "আমার মনে হয়না যে তুমি আমাকে চেন না। তবুও বলছি: আমার নাম জন জ্যাকব। আমি এদেশের একজন রাজনৈতিক নেতা, যে কিনা নির্যাতিত-নিপীড়িতদের কথা বলে; মেহনতি মানুষদের পাশে থাকে। এবং আমার গড়া দল 'জনফ্রন্ট' এর ছাত্র সংগঠন এদেশের বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন।"
"আমি জানি", সংক্ষেপে বলল ফ্রেড।
"তুমি কি জান, ছাত্র সংগঠন মানে কি?" বললেন জন।
"ছাত্র সংগঠন মানে হলো ছাত্রদের নিয়ে গঠিত সংগঠন, যার প্রধান কাজ হলো ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করা, দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার তথা ছাত্রদের মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলীর বিকাশ ঘটানো - ইত্যাদি।" জবাব দিল ফ্রেড।
-"তুমি তো তাহলে সব কিছুই জান এবং বোঝ দেখছি। তাহলে তুমি ছাত্র রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখ কেন?"
-"কারণ এটা হলো একটা ছাত্র সংগঠনের সংজ্ঞা মাত্র। বাস্তবতার সাথে এর বিস্তর পার্থক্য।"
-"তাই নাকি?"
-"হ্যাঁ।"
-"যেমন?"
-"যেমন- বেশ কিছুদিন আগে আপনাদের সাথে আরেক ছাত্র সংগঠনের বিশাল এক কলহ হয়ে গেল। এটা তো ছাত্র সংগঠনের বৈশিষ্ট্য নয়।"
-"তা তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু কেউ যদি তোমাকে আঘাত করে মেরে ফেলতে চায়, তখন তুমি কি করবে? ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে?"
-"অবশ্যই না। কিন্তু এর সাথে ছাত্র সংগঠনের সম্পর্ক কোথায়?"
"আছে, আছে, সম্পর্ক আছে। এটা ঠিক যে, ছাত্র সংগঠনের উদ্দেশ্যের মাঝে কোলাহল ও অন্তর্দ্বন্দ্ব পড়ে না। তথাপি, সকল সংগঠন আসলে এই আদর্শের মাঝে থাকতে পারে না। আর যারা পারে না, তাদের সংগঠনে কোলাহল ও অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা যায়। আর তারা অনেক সময় শত্রুতাবশতঃ অন্য আদর্শবাদী দলের ক্ষতি করতে চায়। আর তখন সেই আদর্শবাদী দলটাকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়।" বলে একটু থামলেন জন। তারপর বললেন, "থাক ওসব কথা। একদিন নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে। এখন কাজের কথায় আসা যাক।" বলে জন একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করেনিলেন। বললেন, "তোমার একটা টিউশনির ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ড্যান তোমাকে সবকিছু বলে দেবে। আর একটা কথা সব সময় আদর্শের মধ্যে থেক। যদি তুমি তোমার আদর্শ থেকে দূরে সরে আস, তবে তোমার ধ্বংস নিশ্চিত।"
পৃথিবী নামে পরিচিত গ্রহ থেকে ২০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এক গ্রহের বাসিন্দা হলো ফ্রেড। সে সবে মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেছে। খুবই ভালো ছাত্র সে। জীবনে সে এক রোল ছাড়া দুই রোল করে নি। সে যে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়ে, তা তার দেশের সব চেয়ে বিখ্যাত একটা প্রতিষ্ঠান। সে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির একজন ছাত্র।
সে যে দেশে থাকে সে দেশের নাম 'সোমার'। তার পৃথিবীতে সব চেয়ে ছোট রাষ্ট্র এটা।
ফ্রেড বড় হয়ে অর্থনীতিবিদ হতে চায়। গরিব ঘরের সন্তান ফ্রেড অনেক কষ্টে এতদূর উঠেছে, অনেক দুঃখ-কষ্ট সে নিরবে মাথা পেতে নিয়েছে, আজ সে প্রতিষ্ঠার দ্বার প্রান্তে উন্নিত হয়েছে।
তার বিশ্ববিদ্যালয়ের যে হলে সে থাকে সেখানে তার একজন রুমমেটও রয়েছে। তার রুমমেটের নাম হলো ড্যান। সে ছাত্র রাজনীতির সাথে বিশেষভাবে জড়িত। সে মাঝে মাঝে ফ্রেডকে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বুঝাতে চেষ্টা করে; কিন্তু সে কানেই নেয় না। তার সামনে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে, তা বাদ দিয়ে সে রাজনীতি করবে! এটা তার মতো কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়া ব্যক্তির কাছে কতকটা নির্মমও ঠেকে।
সারাদিন ফ্রেড পড়াশুনা করে, নিয়মিত ক্লাশ করে, আর অবসর পেলে তার স্বপ্ন নিয়ে ভাবে। অর্থনীতিবিদ হয়ে গ্রামের সবার তাচ্ছিল্লের জবাব দিবে। ভাবতে ভাবতে অনেকসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে। তার রুমমেট এসে তাকে জাগায়।
একদিন একটা চিঠি এল। চিঠিটা তার মায়ের লেখা। চিঠিতে তার মা লিখেছেন যে তার পক্ষে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ যোগান দেয়া সম্ভব নয়। তাকে এখন নিজের খরচ নিজেকেই চালাতে হবে। তার মাথায় যেন বাজ পড়ল। অর্থাভাবে তার অর্থনীতি পড়ার স্বপ্নই না আজ ভেস্তে যায়! তার রুমমেট তার দিকে তাকাল, বলল, "কোনো সমস্যা নাকি, দোস্ত? থাকলে খালি আমাকে বল্। নিমিষেই সমাধান করে দেব।"
ফ্রেড হাসি হাসি ভাব করে বলল, "না, কোনো সমস্যা নাই। বাড়ীর কথা মনে পড়ছিল- এই আর কি!"
প্রকৃত ঘটনা সে নিজের কাছেই রাখল।
একদিন, দুইদিন, তিনদিন- এভাবে সারা মাস চলে গেল। কিন্তু ফ্রেড কোন টিউশনি বা পার্ট-টাইম চাকরী পেতে ব্যর্থ হলো। অবশেষে সে তার রুমমেট ড্যানকে সব কিছু খুলে বলল। তার বন্ধুবর বলল, "ও, এই তাহলে ঘটনা। আমাকে আগে বলবি তো। আমার সাথে চল, আমি তোর ব্যবস্থা করছি।"
ড্যান তাকে নিয়ে গেলো এক ভদ্রলোকের কাছে। লোকটির মুখে দাঁড়ি ভর্তি। সব চুল সাদা। চোখে কালো চশমা।
ড্যান তার কাছে গিয়ে বলল, "এই সেই রুমমেট যার কথা আমি আপনাকে বলেছিলাম।"
লোকটি ফ্রেডকে লক্ষ করে বললেন, "বস বাবা, বস।" তিনি তার দিকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন।
ফ্রেড সন্দেহসূচক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
লোকটা ফ্রেডের দিকে তখনো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েই ছিলেন। ফ্রেড বসতেই তিনি বললেন, "আমার মনে হয়না যে তুমি আমাকে চেন না। তবুও বলছি: আমার নাম জন জ্যাকব। আমি এদেশের একজন রাজনৈতিক নেতা, যে কিনা নির্যাতিত-নিপীড়িতদের কথা বলে; মেহনতি মানুষদের পাশে থাকে। এবং আমার গড়া দল 'জনফ্রন্ট' এর ছাত্র সংগঠন এদেশের বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন।"
"আমি জানি", সংক্ষেপে বলল ফ্রেড।
"তুমি কি জান, ছাত্র সংগঠন মানে কি?" বললেন জন।
"ছাত্র সংগঠন মানে হলো ছাত্রদের নিয়ে গঠিত সংগঠন, যার প্রধান কাজ হলো ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করা, দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার তথা ছাত্রদের মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলীর বিকাশ ঘটানো - ইত্যাদি।" জবাব দিল ফ্রেড।
-"তুমি তো তাহলে সব কিছুই জান এবং বোঝ দেখছি। তাহলে তুমি ছাত্র রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখ কেন?"
-"কারণ এটা হলো একটা ছাত্র সংগঠনের সংজ্ঞা মাত্র। বাস্তবতার সাথে এর বিস্তর পার্থক্য।"
-"তাই নাকি?"
-"হ্যাঁ।"
-"যেমন?"
-"যেমন- বেশ কিছুদিন আগে আপনাদের সাথে আরেক ছাত্র সংগঠনের বিশাল এক কলহ হয়ে গেল। এটা তো ছাত্র সংগঠনের বৈশিষ্ট্য নয়।"
-"তা তুমি ঠিক বলেছ। কিন্তু কেউ যদি তোমাকে আঘাত করে মেরে ফেলতে চায়, তখন তুমি কি করবে? ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে?"
-"অবশ্যই না। কিন্তু এর সাথে ছাত্র সংগঠনের সম্পর্ক কোথায়?"
"আছে, আছে, সম্পর্ক আছে। এটা ঠিক যে, ছাত্র সংগঠনের উদ্দেশ্যের মাঝে কোলাহল ও অন্তর্দ্বন্দ্ব পড়ে না। তথাপি, সকল সংগঠন আসলে এই আদর্শের মাঝে থাকতে পারে না। আর যারা পারে না, তাদের সংগঠনে কোলাহল ও অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা যায়। আর তারা অনেক সময় শত্রুতাবশতঃ অন্য আদর্শবাদী দলের ক্ষতি করতে চায়। আর তখন সেই আদর্শবাদী দলটাকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়।" বলে একটু থামলেন জন। তারপর বললেন, "থাক ওসব কথা। একদিন নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে। এখন কাজের কথায় আসা যাক।" বলে জন একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করেনিলেন। বললেন, "তোমার একটা টিউশনির ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ড্যান তোমাকে সবকিছু বলে দেবে। আর একটা কথা সব সময় আদর্শের মধ্যে থেক। যদি তুমি তোমার আদর্শ থেকে দূরে সরে আস, তবে তোমার ধ্বংস নিশ্চিত।"
Subscribe to:
Posts (Atom)