ডায়রী লিখতে বসেছে ফ্রেড। ডায়রী লেখার অভ্যাসটা ফ্রেডের আগে ছিল না। মাস
দুয়েক আগে কেন জানি তার মনের মধ্যে উদয় হলো যে ডায়রী লেখা দরকার। ব্যাস,
অমনি বাজার থেকে একটা ডায়রী কিনে নিয়ে এলো সে। সপ্তাহ দুয়েক থেকে তার কলেজ
বন্ধ: "শরৎকালীন অবকাশ"।
অনেক চেষ্টা করেও সে আজকে কি বার - তা বের
করতে পারল না। ভাবল, ড্যানকে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো তার যে
ড্যান বাড়ি চলে গেছে। আসলে, সবাই বাড়ি চলে গেছে, শুধু সে একাই আছে। যেন
গোটা হল কয়েকদিনের জন্য তার নিজের হয়ে গেছে। হঠাৎ নিজেকে বড্ড একা মনে হলো
তার। মনে পড়ল তার মায়ের কথা, কতদিন থেকে যে সে বাড়ি যায় না - তার হয়তো কোনো
সঠিক হিসেব সে দিতে পারবে না। কেনই বা সে বাড়ি যাবে? ওই বাড়ি কি এখনো তার
নিজের আছে? মাস ছয়েক আগে তার মা তাকে চিঠি পাঠিয়েছিল যে তিনি আর ফ্রেডের
খরচ বহন করতে পারবেন না, কে জানত যে তা তিনি করেছেন নিজের ছেলেকে পর করার
জন্য।
সত্য কথাটা ফ্রেড জানতে পেরেছে মাস চারেক আগে তার বড় চাচার
মাধ্যমে: তার মা আরেকটা বিয়ে করেছেন। এটা শুনে একেবারে ভেঙে পড়েছিল সে। তার
বাবা মারা যাবার পর দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছর তার মা বিধবা থেকেছেন, এখন জীবনের
শেষ সময়ে এসে তাঁকে কেন নতুন করে বিয়ে করতে হলো তা তার মাথায় আসে না। তিনি
তো তার শ্বশুরালয়ে মন্দ ছিলেন না। তাঁকে তারা এমনকি রান্না করার কাজটিও
করতে দিতেন না। মানুষ সত্যি নিজের সুখ বুঝতে পারে না। তার চাচা অবশ্য তাকে
বলেছিল যে, সে চাইলে তিনি তাকে প্রতিমাসে টাকা পাঠাতে পারবেন। সে জবাব দেয়
যে দরকার হলে সে অবশ্যই চাইবে। কিন্তু মনে মনে চিন্তা করে সে, কোন মুখে সে
তার চাচার কাছে সাহায্য চাইবে যখন তার মা এমন একটি কাজ করে বসল।
ফ্রেড
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আজ তার আর ডায়রী লেখা হলো না, যেতে হবে টিউশনিতে।
জন অবশ্য বলেছিল যে চাইলে সে ছুটি নিতে পারে। কিন্তু সে ছুটি নেয়নি। ছুটি
নিয়ে তার কি হবে? তার তো আর কোনো বাড়ি নেই। আগে তার মা রোজ তার কাছে চিঠি
লিখত কিন্তু নতুন বিয়ের পর ওটাই ছিল তার শেষ চিঠি। একজন মা কি করে এমন
পাল্টাতে পারে ফ্রেড বুঝতে পারে না।
তাড়াতাড়ি করে শার্টটা পাল্টিয়ে
রওনা হলো সে। জগতের মানুষগুলো বড়ই অদ্ভুত। তারা শুধু ছুটছে আর ছুটছে,
কিন্তু কোন দিকে ছুটছে, কেন ছুটছে, তা তাদের অনেকেরই অজানা। আর যে সামান্য
সংখ্যক মানুষ জানে তারাও অনেকে না জানার ভান করে থাকে। মানবজাতির এ
দুরবস্থার জন্য কষ্ট পায় ফ্রেড। ড্যান অবশ্য তাকে বলে যে শুধু কষ্ট পেলেই
চলবে না, এ দুরবস্থা থেকে মানবজাতির মুক্তির জন্য কাজ করতে হবে। কিন্তু সে
একা কীভাবে এতবড় দায়িত্ব পালন করতে পারবে? এজন্য তো প্রয়োজন দলবদ্ধ
প্রচেষ্টা। এই কথাটা অবশ্য সে ড্যানকে বলে না, কারণ সবকিছুতেই রাজনীতিকে
টেনে আনা ড্যানের একটা বদ অভ্যাস। হ্যাঁ, সে এটা নিজেও স্বীকার করে যে
রাজনীতি ছাড়া দেশ অচল। কিন্তু তাই বলে তো আর সবখানে রাজনীতি চলে না! সব
কিছুরই তো একটা সীমা থাকা উচিত। সে অন্ততঃ ছাত্রজীবনে রাজনীতি থেকে বিরত
থাকবে - এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে যদিও ইদানিং তার ভয় হয় যে সে হয়ত
ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়বে। সে এ ব্যাপারে আরো সাবধান হতে চেষ্টা
করছে।
না, আজকে তার বোধ হয় একটু দেরিই হয়ে গেল। সন্ধা নেমে আসছে, অথচ
আজ তার যাবার কথা ছিল বিকেলে। আজই প্রথমবারের মতো সে পিটারসন মেমোরিয়ালের
পাশ দিয়ে যাবার সময় পিটারসনের মূর্তির দিকে একবারও তাকাল না।